জুলাই সনদ বাস্তবায়ন শুধু জামায়াত-এনসিপি বা ১১ দলের নয়, এ দাবি দেশের ৭০ ভাগ মানুষের। কেননা তারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে ভোট দিয়েছে। সুতরাং এ বিষয়টি সংসদেই সমাধান করা সম্ভব। কিন্তু সংসদে সমাধানযোগ্য একটি বিষয়কে রাজপথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এটি ঠিক হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার। শনিবার (২০ জুন) খুলনার ঐতিহাসিক সার্কিট হাউজ ময়দানে অনুষ্ঠিতব্য ১১ দলের বিভাগীয় সমাবেশ সফলের লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) দুপুরে খুলনা প্রেসক্লাবের হুমায়ুন কবীর বালু মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন। প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “আমরা রাজপথে নামতে চাইনা। চাই সংসদেই সবকিছু সমাধান করতে। কিন্তু সরকার আমাদেরকে বাধ্য করলে রাজপথই হবে চূড়ান্ত জায়গা। কারণ প্রেমতো একতরফা হয়না।”

সীমান্তে পুশইন সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে জামায়াতের এই সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, এটি নিয়ে সংসদে একজন এমপি নোটিশ দিয়ে কথা বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাকে সেটি প্রত্যাহারে বাধ্য করা হয়েছে। এতেই প্রমাণ হয় কোথা থেকে কি হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কেউ আমাদের ওপর দাদাগিরি করে আধিপত্যবাদের সেবাদাস বানাক সেটি আমরা চাই না। সব বিভাগের সমাবেশ শেষ হলে ১১ দলের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক থেকে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ব্রিফিংয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বিএনপির সমালোচনা করে বলেন, “আওয়ামী লীগ আমলে দলীয় করণের নজির আমরা দেখেছি। কিন্তু এখনতো আরও বেশি দেখছি। স্থানীয় সরকার বিভাগের সব নিয়মকে তোয়াক্কা না করে সিটি কর্পোরেশন, জেলা পরিষদ এমনকি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষেও প্রশাসক বসিয়ে দলীয় করণের নজির স্থাপন করা হয়েছে। এখনতো দেখছি বিএনপির শ্লোগান পরিবর্তন করা উচিত। সবার আগে বাংলাদেশ নয়, সবার আগে বিএনপি শ্লোগান হওয়া উচিত।”

তিনি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আইন-শৃঙ্খলার চরম বিপর্যয়, একচ্ছত্র দলীয়করণ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধিসহ সার্বিক জনদুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরে সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন।

মিয়া গোলাম পরওয়ার তাঁর বক্তব্যে বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে তরুণ প্রজন্মের হাজারো শহীদের রক্ত এবং ত্যাগ ও রক্তক্ষয়ী স্মৃতির বিনিময়ে দেশের ১৮ কোটি মানুষ একটি বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের আকাক্সক্ষা করেছিল। সেই রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে দীর্ঘ ৯ মাস ধরে বিএনপি ও জামায়াতসহ ৩৩টি রাজনৈতিক দল দফায় দফায় বৈঠক করে ৮৪টি সাংবিধানিক, আইনি ও প্রশাসনিক বিষয়ে একমত হয়ে 'জুলাই সনদ' তৈরি করেছিল। তিনি বলেন, বিগত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে প্রায় ৫ কোটি মানুষ (৭০ শতাংশ ভোটার) কোনো নোট অফ ডিসেন্ট বা দ্বিমত ছাড়াই এই জুলাই সনদের পক্ষে হ্যাঁ ভোট দিয়ে একে গ্রহণ করেন। নির্বাচনের আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীসহ বিএনপির শীর্ষ নেতারা এই সনদের পক্ষে সারা দেশে ক্যাম্পেইন করেছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় বসার পর তারা ১৮০ ডিগ্রি ইউটার্ন নিয়ে বলছেন যে, এই গণভোট ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ নাকি বেআইনি ও সংবিধান পরিপন্থী।

তিনি অভিযোগ করেন, ক্ষমতাসীন দল এখন কাঠামোগত সংস্কার না করে কেবল নিজেদের ইচ্ছামতো কিছু সংশোধন করতে চায়। প্রধানমন্ত্রীর সীমাহীন ক্ষমতার লাগাম টানা, উচ্চ কক্ষের আসন ভাগাভাগিতে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা পি আর চালু করা এবং বিচার বিভাগ ও সাংবিধানিক পদগুলোতে নিরপেক্ষ নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবগুলো থেকে বিএনপি এখন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বিদ্যমান ব্যবস্থার সংস্কার না হলে যারাই প্রধানমন্ত্রী হবেন, তারাই আরেকটা শেখ হাসিনা হয়ে দেশের ওপর ফ্যাসিবাদী শাসন চাপিয়ে দেবেন।

প্রেস ব্রিফিংয়ে দেশের বর্তমান জনদুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সরকার গ্যাস, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম দফায় দফায় বাড়িয়েছে। আধুনিক চিকিৎসার এই যুগে কেবল সরকারের নির্লিপ্ততা ও ভ্যাকসিনের অব্যবস্থাপনার কারণে হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে বেশ কয়েকটি শিশুর নির্মম মৃত্যু হয়েছে, অথচ সরকার শুধু অতীতের দোষ দিয়ে বেঁচে যেতে চায়।

সারাদেশে এবং বিশেষ করে খুলনার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ঘটেছে উল্লেখ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, খুলনার ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের আয়রন মার্কেটে প্রতিটি দোকান থেকে ১০ হাজার টাকা করে চাঁদা দাবি করায় গত এক সপ্তাহ ধরে ৭০টি দোকান বন্ধ রয়েছে। এছাড়া শিশু হত্যা, খন্ডবিখন্ড লাশ উদ্ধার, মসজিদের ভেতর ঢুকে গুলি এবং ধর্ষণের পর নৃশংস হত্যাকান্ডের মতো বর্বর ঘটনা নিত্যদিনের চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২১ জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর খুলনা সফরের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তো এখন আইন-শৃঙ্খলার চেয়ে সংবিধান নিয়ে বেশি ব্যস্ত।

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জনদুর্ভোগ নিরসন এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন দাবিতে খুলনা সার্কিট হাউজ মাঠের এ সমাবেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ উপস্থিত হবেন উল্লেখ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এ জন্য শহরের যানজট নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি ১১ দলের নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক নিয়োজিত থাকবে। আড়াইশ’ থেকে তিনশ’ হর্ণ থাকবে সার্কিট হাউজ ছাড়াও শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে। যাতে মানুষ সার্কিট হাউজে না গিয়েও বক্তব্য শুনতে পারে। বিভাগের বাকী নয়টি জেলা থেকে আগত যানবাহনগুলো নির্দিষ্ট স্থানে রাখার জন্য সাংগঠনিকভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দুপুর ২টা থেকে আসরের নামাজের আগ পর্যন্ত সমাবেশের মূল কার্যক্রম চলবে। তবে এর আগেও স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ বক্তৃতা করবেন।

সমাবেশ বাস্তবায়নের সমন্বয়ক এডভোকেট শাহ আলমের পরিচালনায় সভাপতির বক্তব্য রাখেন সমাবেশ বাস্তবায়ন কমিটির আহবায়ক, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও যশোর-কুষ্টিয়া অঞ্চল পরিচালক মোবারক হোসাইন সদস্য সচিব, সমাবেশ বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য সচিব, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা মহানগরী আমীর মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান। এ সময় খুলনা জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা এমরান হুসাইন, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি সাবেক কাউন্সিলর মাস্টার শফিকুল আলম, জাতীয় নাগরিক পার্টির খুলনা মহানগর সংগঠক আহম্মদ হামিম রাহাত, রমজান শেখ, খালিদ সাইফুল্লাহ, নূরুল হক নূর, যুথি আক্তার ও রফিক, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহবায়ক ও মহানগর সভাপতি মুফতি শরীফ সাঈদুর রহমান, হাফেজ মো. শহীদুল ইসলাম, মাওলানা মুজাহিদুর রহমান ও জেলার মাওলানা মাহফুজুর রহমান, খেলাফত মজলিসের খুলনা জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম সাজ্জাদ হোসেন চঞ্চল, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের খুলনা জেলা সেক্রেটারি মুফতি ইব্রাহিম খলিল, বাংলাদেশ লেবার পার্টির মহানগর সভাপতি অধ্যক্ষ এস এম সাইফুদ্দোহা, খুলনা মহানগরী জামায়াতের নায়েবে আমীর অধ্যাপক নজিবুর রহমান, মহানগরী সহকারী প্রিন্সিপাল শেখ জাহাঙ্গীর আলম ও আজিজুল ইসলাম ফারাজী, জেলা সহকারী সেক্রেটারি মুন্সি মঈনুল ইসলাম, স ম এনামুল হক, মো. আব্দুল গফুর, খুলনা মহানগরী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি ইসরাফিল হোসেনসহ ১১ দলীয় ঐক্যের কেন্দ্রীয় ও খুলনা বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

প্রেস ব্রিফিং শেষে মিয়া গোলাম পরওয়ার ও জামায়াত-এনসিপিসহ ১১ দলীয় ঐক্যের নেতৃবৃন্দ নগরীর স্যার ইকবাল রোড, পিকচার প্যালেস মোড়, বাংলাদেশ ব্যাংকের মোড়সহ নগরীর বিভিন্ন স্থানে সমাবেশের লিফলেট বিতরণ করেন। পরে তারা সার্কিট হাউজ মাঠে নির্মাণাধীন সমাবেশের বিশাল মঞ্চ পরিদর্শন করেন।

২০ জুন (শনিবার) খুলনা সার্কিট হাউজ মাঠের এ সমাবেশে প্রধান অতিথির ভাষণ দেবেন সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এমপি। বক্তব্য রাখবেন বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এমপি, লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্ণেল অলি আহমদ বীর বিক্রম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর শাইখুল হাদিস আল্লামা মামুনুল হক, খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাওলানা আবদুল কাইয়ুম সোবহানী, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমীর মাওলানা হাবীবুল্লাহ মিয়াজী, আমার বাংলাদেশ পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র রাশেদ প্রধান ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান এডভোকেট এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন। সমাবেশে সভাপতিত্ব করবেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার।