কামরুজ্জামান হিরু
বিশ্বকাপের শেষ ষোলর লড়াইয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়লেও শেষ পর্যন্ত জয় তুলে নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে ফ্রান্স। ফিলাডেলফিয়ায় অনুষ্ঠিত ম্যাচে প্যারাগুয়েকে ১-০ গোলে হারিয়েছে দিদিয়ের দেশমের শিষ্যরা। ম্যাচের একমাত্র গোলটি অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পের পেনাল্টি থেকে এসেছে। এই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপে এমবাপ্পের মোট গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯-এ। এর মধ্যে নকআউট পর্বেই তার গোল ১১টি, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে কোনো ফুটবলারের সর্বোচ্চ। শুধু তাই নয়, বিশ্বকাপের পরপর তিনটি আসরের নক আউট পর্বে তিন বা তিনের অধিক গোল করা একমাত্র ফুটবলারও এমবাপ্পে। আগামী ৯ জুলাই আগের আসরের সেমিফাইনালের পুনরাবৃত্তিতে মুখোমুখি হবে ফ্রান্স ও মরক্কো। ফ্রান্স সেবার মরক্কোকে হারিয়ে ফাইনালের টিকিট পেয়েছিল। এবার দুই দলের শেষ আটেই দেখা হয়ে যাবে। নিশ্চিতভাবেই মরক্কো প্রতিশোধ নিতে মুখিয়ে থাকবে। অপরদিকে গত আসরের রানার্সআপ ফ্রান্স চাইবে জয়ের ধারাবাহিকতা রক্ষার।
প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল এবারের বিশ্বকাপে ফ্রান্সের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। পুরো ম্যাচজুড়ে রক্ষণাত্মক ও শারীরিক ফুটবল খেলেছে প্যারাগুয়ে। বারবার ফাউল, শক্ত ট্যাকল ও জার্সি টেনে ফরাসি আক্রমণের গতি থামানোর চেষ্টা করে তারা। এতে মাঠে কয়েকবার উত্তেজনাও ছড়িয়ে পড়ে। পুরো ম্যাচে বলের দখল, আক্রমণ ও সুযোগ সৃষ্টিতে একচেটিয়া আধিপত্য ছিল ফ্রান্সের। ৭৬ শতাংশ বলের দখল ধরে রেখে তারা ১৫টি শট নেয়, যেখানে প্যারাগুয়ের শট ছিল মাত্র পাঁচটি। এছাড়া ফরাসিরা ৫৫২টি পাস সম্পন্ন করে, বিপরীতে প্যারাগুয়ের ছিল ১৭৫টি।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে ফ্রান্স। তৃতীয় মিনিট থেকেই তারা বলের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং একের পর এক আক্রমণ সাজাতে থাকে। অষ্টম মিনিটে প্রথম কর্নার পেলেও তা থেকে গোল আদায় করতে পারেনি। ১১ মিনিটের মধ্যেই ৯০ শতাংশ বলের দখল ছিল ফরাসীদের। ২৩ মিনিটে টানা চতুর্থ কর্নার এবং ৪২ মিনিটে সপ্তম কর্নার পেলেও প্যারাগুয়ের রক্ষণভাগ ও গোলরক্ষক অরলান্ডো গিলকে ভাঙতে পারেনি তারা। ৩১ মিনিটে ওসমান ডেম্বেলের ক্রসে কিলিয়ান এমবাপ্পে হেডের সুযোগ পেলেও বলে ঠিকমতো সংযোগ করতে পারেননি। ৩৬ মিনিটে আন্দ্রেস কুবাসের ফাউলের পর এমবাপ্পেকে ঘিরে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। ডেম্বেলেও সেই বাগিবিত-ায় জড়িয়ে পড়েন। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন রেফারি। প্রথমার্ধে ৭৮ শতাংশ বলের দখল ও ছয়টি শট নিয়েও গোলের দেখা পায়নি ফ্রান্স। অন্যদিকে প্যারাগুয়ের দুটি শটও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। ফলে বিরতিতে দুই দলই গোলশূন্য সমতায় মাঠ ছাড়ে।
দ্বিতীয়ার্ধেও একই চিত্র দেখা যায়। ফ্রান্স একের পর এক আক্রমণ চালালেও প্যারাগুয়ের রক্ষণভাগ ছিল বেশ সংগঠিত। ৫৫ মিনিটে মানু কোনোয়ের দূরপাল্লার শট দারুণ দক্ষতায় ফিরিয়ে দেন গোলরক্ষক গিল। ৫৮ মিনিটে ইনজুরির কারণে ওমার আলদেরেতে এবং ৬১ মিনিটে হুলিও এনসিসো মাঠ ছাড়েন। তাদের পরিবর্তে নামেন হোসে কানালে ও গুস্তাভো কাবায়েরো। একই সময়ে ফ্রান্সও ব্র্যাডলি বারকোলার জায়গায় মাঠে নামায় দেজিরে দুয়েকে। ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ হয় ৬৭ মিনিটে। প্যারাগুয়ের বক্সে দেজিরে দুয়ে ফাউলের শিকার হলে প্রথমে খেলা চালিয়ে যেতে বলেন রেফারি। পরে ভিএআরের সহায়তায় সিদ্ধান্ত বদলে ফ্রান্সকে পেনাল্টি দেন। ৭০তম মিনিটে স্পটকিক থেকে নিখুঁত শটে গোল করে ফ্রান্সকে এগিয়ে দেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। চলতি বিশ্বকাপে এটি ছিল তার সপ্তম গোল, যার মাধ্যমে তিনি আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসির সঙ্গে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় উঠে আসেন।
গোল হজমের পর আক্রমণের তীব্রতা বাড়ায় প্যারাগুয়ে। ৯০ মিনিটে মৌরিসিওর দূরপাল্লার শট দক্ষতার সঙ্গে ঠেকিয়ে দেন ফরাসি গোলরক্ষক মাইক মেনিয়ান। অন্যদিকে যোগ করা সময়ে ব্যবধান দ্বিগুণ করার একাধিক সুযোগ পেয়েছিলেন এমবাপ্পে। ৯৬তম মিনিটে টানা দুটি শট নিলেও দুটিই দুর্দান্ত সেভ করে প্যারাগুয়েকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন গোলরক্ষক অরলান্ডো গিল। ১০ মিনিট অতিরিক্ত সময় শেষে আর কোনো গোল না হলে ১-০ ব্যবধানের জয় নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করে ফ্রান্স। শেষ বাঁশি বাজার পর দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে কিছুটা উত্তেজনা দেখা দিলেও বড় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
ম্যাচ শেষে প্যারাগুয়ের খেলার ধরন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এমবাপ্পে। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনে আমাদের নোংরা খেলতে হলে, আমরা সেটাও করব। প্যারাগুয়ে ভেবেছিল আমরা শুধু সুন্দর ফুটবল খেলতে এসেছি। কিন্তু আমরাও কঠিন ও শারীরিক ফুটবল খেলতে জানি। আজ তারা যেমন খেলেছে, আমরাও প্রয়োজনে সেভাবেই খেলতে পারি।’ এমবাপ্পে কতটা রেগে ছিলেন তা স্পষ্ট বোঝা গেছে ম্যাচের পর। প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক ওরলান্ডো গ্রিল ম্যাচের পর শুভেচ্ছা জানাতে এমবাপ্পের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ফরাসি তারকা তার দিকে ফিরেও তাকাননি। পরে রাগে গ্রিল এমবাপ্পের পিঠে বল ছুঁড়ে মারেন। যদিও এমবাপ্পে জয়ের আনন্দে পেছনেও ফিরে তাকাননি।
বর্তমানে এই বিশ্বকাপে এমবাপ্পে ও লিওনেল মেসি-দু’জনেরই গোল সংখ্যা ৭। ফলে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে সমানতালে এগিয়ে আছেন দ’ুজনই। এখন এমবাপ্পের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ মরক্কো। তার লক্ষ্য একটাই- কোয়ার্টার ফাইনাল পেরিয়ে ফ্রান্সকে টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে তোলার পথে আরেক ধাপ এগিয়ে নেওয়া। আগামী শুক্রবার মরক্কোর বিপক্ষে মাঠে নামবে ফ্রান্স।