মোঃ কায়সার হামিদ (জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাবেক ফুটবলার) : ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে হেরে গেছে ফ্রান্স আর ইংল্যান্ড। তারা মুখোমুখি হবে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে। ম্যাচটি দুই দলের জন্য সান্ত্বনার। আবার কষ্টেরও। ফাইনালে উঠতে না পারার বেদনা নিয়ে দুই খেলোয়াড়দের মাঠে নামতে হবে পরস্পরের বিরুদ্ধে। তবু , ফ্রান্স আর ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের জন্য স্থান নির্ধারণী ম্যাচটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কিলিয়ান এমবাপ্পে মেসির সমান ৮ গোল করেছেন। দুজনেই ‘গোল্ডেন বুট’ জয়ের দৌড়ে আছেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এক বা একাধিক গোল পেলে এমবাপ্পে এগিয়ে যাবেন। আবার জুড বেলিংহ্যাম আর হ্যারি কেইন করেছেন ছয়টি করে গোল। ইংল্যান্ডের দুই তারকার গোলসংখ্যা বাড়িয়ে নেয়ার কিংবা মেসি আর এমবাপ্পেকে টপকে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই , তবে দেখতে পাব, অতীতে অনেক খেলোয়াড় তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে গোল করে ‘গোল্ডেন বুট’ জিতে নিয়েছেন। ২০১০ বিশ্বকাপে জার্মানির থমাস মুলার, ১৯৯৮ সালে ক্রোয়েশিয়ার ডাভর সুকের, ১৯৯০ সালে ইতালির সালভাতোরে শিলাচি এবং ১৯৩৮ সালে ব্রাজিলের লিওনিদাসরা নির্দিষ্ট ম্যাচটিতে গোল করে আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন। তাই তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ শুধু সান্ত্বনার লড়াই নয়, গোল্ডেন বুটের দৌড়েও হতে পারে ভাগ্য বদলের মঞ্চ।

চলতি বিশ্বকাপের সেরা গোলরক্ষকের ‘গোল্ডেন-গ্লোভ’ বিজয়ী সম্ভবত নির্ধারিত হবে স্পেন আর আর্জেন্টিনার মধ্যকার ফাইনালে। স্প্যানিশ কিপার উনাই সিমনের সম্ভাবনাই বেশী। এথলেটিক বিলবাওয়ের কিপার বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ৬টি ম্যাচে ক্লিন-শিটের রেকর্ড গড়েছেন। সেমিফাইনাল পর্যন্ত সাত ম্যাচে মাত্র ১টি গোল হজম করেছেন। আবার বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ৬৪৯ মিনিট গোল না খাওয়ার রেকর্ড গড়েছেন। তার প্রতিপক্ষ হতে পারেন এমি মার্টিনেজ। যদিও পুরো আসরে ৬টি গোল হজম করেছেন এমি, কিন্তু ফাইনালে ওঠায় তিনিও থাকবেন লড়াইয়ে। বিশেষ করে ফাইনালে তিনি দুর্দান্ত পারফর্মেন্স দেখিয়ে তিনিও পেয়ে যেতে পারেন ‘গোল্ডেন গ্লোভ’। এখানে বলে রাখি, উনাই সিমনের দল স্পেন বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হলে ‘ গোল্ডেন বল’ জয়ের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। ২০০২ সালে ব্রাজিলের বিপক্ষে ফাইনালে হারার পরেও জার্মানির অলিভার কান ‘গোল্ডেন বল’ পেয়েছিলেন। তাই উনাই সিমন কেন নয়?

অবশ্য ‘গোল্ডেন বল’টা লিওনেল মেসির কাছে যাচ্ছে বলেই ধরে নেয়া যায়। গোলের সংখ্যা আটটি। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে মেসি শুধু গোল করেই নয়, আক্রমণভাগ পরিচালনা, সুযোগ তৈরি এবং সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। মাঠে তার ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের কারণে বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি হিসেবে দেওয়া ‘গোল্ডেন বল’ জয়ের অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন তিনি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে দুটি অ্যাসিস্ট করেছেন মেসি। সব মিলিয়ে টুর্নামেন্টে তার অ্যাসিস্ট রয়েছে ৪টি। মেসি ‘গোল্ডেন বল’ জিতলে সৃষ্টি হবে নতুন ইতিহাস। একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের তিনটি (২০১৪ আর ২০২২ সালেও জিতেছিলেন) ‘গোল্ডেন বল’ থাকবে তার নামের পাশে। মেসি চলে যাবেন সকলের ধরাছোঁয়ার বাইরে। আবার তৃতীয় স্থান নির্ধারণী আর ফাইনালে এমবাপ্পে আর মেসি কেউ গোল না পেলেও ‘গোল্ডেন বুট’ পাবেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক, অ্যাসিস্টে এগিয়ে থাকায়। দেখা যাক , মেসি বিশ্বকাপের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে একইসাথে সেরা খেলোয়াড় আর সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার জয়ের ইতিহাস গড়তে পারেন কি না।

শোনা যাচ্ছে, তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ময়াচটি খেলতে অনীহা প্রকাশ করছেন ইংল্যান্ড আর ফ্রান্সের সেরা খেলোয়াড়রা। আগেই বলেছি , ফাইনালের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার পর এই ম্যাচটিতে মনোযোগ দেয়া কঠিন। তবে আমার মতে, এমবাপ্পের খেলা উচিত। বিশ্বকাপে মেসির গোল ২১টি। এমবাপ্পের ২০টি। দুটি গোল করলেই এমবাপ্পে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হতে পারবেন। শর্ত, মেসিকে ফাইনালে গোল পাওয়া চলবে না। তাই এমবাপ্পের সামনে সর্বোচ্চ গোলের ইতিহাস গড়ার একটা সুযোগ থাকছে।

স্পেনের লামিনে ইয়ামাল আর পাউ কুবার্সির মধ্যে যে কেউ পেতে পারেন চলতি বিশ্বকাপের ‘সেরা উদীয়মান তারকা’র পুরস্কার। দুই তরুণ স্পেনকে ফাইনালে তোলার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। আমি আপাতত ‘বেস্ট ইয়াং প্লেয়ার এ্যাওয়ার্ড’ জয়ের দৌড়ে আর কাউকে দেখছি। দু’জনের বয়সই ২০-এর নীচে । মরক্কোর আয়ুব বুয়াদ্দি কিংবা এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে কম বয়সের গিলবার্টো মোরাতার দল ছিটকে গেছে সেমির আগেই। তাই ইয়ামাল আর কুবার্সির মধ্যেই নির্ধারিত হবে ‘বেস্ট ইয়াং প্লেয়ার এ্যাওয়ার্ড’, আমি নিশ্চিত।