ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, পিএলসি নিয়ে সৃষ্ট অচলাবস্থা দূর হতে চলেছে। গ্রাহক-আমানত এবং শুভানুধ্যায়ীদের দাবির মুখে বাংলাদেশ ব্যাংক অবশেষে এ ব্যাংকের বিতর্কিত চেয়ারম্যানসহ পুরো পরিচালনা বোর্ড ভেঙে দিয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত ব্যাংকের পর্ষদের সব ক্ষমতা ও দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং জগতের বিস্ময়, গ্রাহকদের আস্থার প্রতীক বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংক নিয়ে অনেক দিন ধরেই নানামুখী ষড়যন্ত্র চলছিল। বিশেষ করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’র উপর একটি মহলের শ্যেন দৃষ্টি পড়ে। এর মূল কারণ হচ্ছে, বিগত সরকার আমলে দলীয় বিবেচনায় যেসব ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হয় তার কোনোটিই গ্রাহক আস্থা অর্জন করতে পারেনি। ব্যাংকগুলো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছিল। বিগত সরকার আমলে সর্বশেষ ৯টি ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হয়। সে সময় বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের জানিয়েছিল, দেশে ব্যাংকের সংখ্যা বেশি হয়ে গেছে। কাজেই এ মুহূর্তে নতুন করে কোনো ব্যাংক স্থাপনের প্রয়োজন নেই। কিন্তু অর্থমন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠার বিভাগে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতামত উপেক্ষা করে নয়টি নতুন ব্যাংকের অনুমোদন প্রদান করে। সে সময় সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেছিলেন, এ মুহূর্তে দেশে নতুন ব্যাংকের কোন প্রয়োজন নেই। তারপরও রাজনৈতিক বিবেচনায় ৯টি ব্যাংক স্থাপনের অনুমোদন দেয়া হলো। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মতো স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনে তাগিদেই স্থাপন করতে হয়, রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়।

রাজনৈতিক বিবেচনায় স্থাপিত ব্যাংকগুলো আমানত সংগ্রহ এবং গ্রাহক আকৃষ্টকরণে তেমন কোনো সাফল্য দেখাতে পারছিলো না। তখন বাংলাদেশ ব্যাংক এসব ব্যাংককে বিশেষ কিছু সুবিধা প্রদান করে। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ফুপাতো ভাই ব্যারিস্টার ফজলে নুর তাপসের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত মধুমতি ব্যাংক এবং বিতর্কিত ব্যক্তি ড. মহীউদ্দীন আলমগীরের ফার্মার্স ব্যাংককে বিশেষ সুবিধা প্রদানের জন্য ব্যাংকিং আইনকে এমনভাবে পরিবর্তন করা হয় যা ছিল নজিরবিহীন। আগে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত অর্থের ২৫ শতাংশ ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকে সংরক্ষণ করা যেতো। এ নীতির পরিবর্তন ঘটিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ৫০ শতাংশ উদ্বৃত্ত অর্থ ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকে আমানত হিসেবে সংরক্ষণের অনুমতি দেয়া হয়। এভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক যখন ব্যাংক ঋণের সুদের হার এবং আমানতের উপর প্রদেয় সুদের হার নির্ধারণ করে তখন বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়। বলা হয়, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের আমানত সংরক্ষণ করলে সাড়ে ৫ শতাংশ সুদ পাওয়া যাবে। আর ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকে আমানত রাখলে সেখানে ৬ শতাংশ হারে সুদ পাওয়া যাবে। অনেকেই দশমিক ৫০ শতাংশ বেশি সুদ পাবার আশায় ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকে তাদের আমানত সংরক্ষণ করে বিপদে পড়ে। অধিকাংশ ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংক সময় মতো গ্রাহকদের চাহিদাকৃত আমানত ফেরত দিতে পারেনি।

বিগত সরকার আমলে রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং দাপট কাজে লাগিয়ে চট্টগ্রামের বিতর্কিত ব্যবসায়ী, যিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি ৬টি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মালিকানা লাভ করে। বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি নিয়ে সে সময় নজিরবিহীন ষড়যন্ত্র করা হয়। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে একটি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে বাসা থেকে ধরে নিয়ে পদত্যাগ পত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। প্রকাশ্য দিবালোকে ব্যক্তি খাতের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংক পিএলসিকে বিতর্কিত এস আলম গ্রুপের হাতে তুলে দেয়া হয়। এস আলম গ্রুপ ও তার সহযোগী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঋণ মঞ্জুরের নামে ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়ে বিদেশে পাচার করা হয়। বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’র বিদেশী শেয়ার হোল্ডারগণ তাদের শেয়ার প্রত্যাহার করে চলে যায়। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন হলে বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলম বিদেশে পালিয়ে যান। বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংক আবারো পুরনো মালিকানায় ফিরে আসে। কিন্তু এ ব্যাংকের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র অব্যাহত থাকে। এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ব্যক্তিদের বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংক পিএলসিতে সংশ্লিষ্ট করা এতে ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিয়ে মারাত্মক শঙ্কা তৈরি হয়। চারিদিকে আতঙ্ক চড়িয়ে পড়ে যে, বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংক আবারো পুরনো মালিকানায় চলে যাচ্ছে। গ্রাহকগণ ব্যাংকের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলেতে শুরু করে। আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে গ্রাহকগণ তাদের আমানত তুলে নিয়ে থাকে। এতে ব্যাংকের তারল্য সঙ্কট দেখা দেবার উপক্রম হয়। গ্রাহক এবং শুভানুধ্যায়ীগণ প্রতিবাদী হয়ে উঠে। তারা ব্যাংকের নতুন বিতর্কিত চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের অপসারণের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক বিতর্কিত চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের অপসারণ করেছে।

তবে এখানেই শেষ নয়। আগামীতে ব্যাংকের শেয়ার হোল্ডারগণ যাতে তাদের ইচ্ছেমতো উপযুক্ত ব্যক্তিদের দ্বারা এ ব্যাংক পরিচালনার সুযোগ পান সে ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের উপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কোনোভাবেই কাম্য নয়।