আমানুর রহমান

বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশ একটি বহুল আলোচিত নাম। ‘উন্নয়নের রোল মডেল’ হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের পরিচিতির পেছনে রয়েছে গগনচুম্বী জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মেগা প্রকল্প আর বিলিয়ন ডলারের ক্রমবর্ধমান রপ্তানি আয়। কিন্তু এই চকচকে প্রবৃদ্ধির পর্দার আড়ালে শোনা যায় এক দীর্ঘশ্বাস। যে সুবিশাল ইমারতের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের এই অর্থনৈতিক অহংকার, তার প্রতিটি ইট গাঁথা হয়েছে এদেশের খেটে খাওয়া লাখো শ্রমিকের রক্ত, ঘাম আর অশ্রু দিয়ে। অথচ, অর্থনীতির চাকা সচল রাখা শ্রমিকরাই আজ সবচেয়ে বেশি অবহেলিত ও শোষিত। সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো ঊর্ধ্বমুখী হলেও ব্যক্তিপর্যায়ে সাধারণ শ্রমিকের জীবন যেন এক অন্তহীন সংগ্রাম।

দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি আমাদের পোশাক শ্রমিকরা। বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয়ের এই খাতের ওপর ভর করেই অর্থনীতির চাকা ঘুরছে। অথচ এই শ্রমিকদের জীবনের গল্পটা চরম বঞ্চনার। মেশিনের শব্দের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হাড়ভাঙা খাটুনির পর মাস শেষে তারা যে মজুরি পান, তা দিয়ে আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতির বাজারে পরিবারের অন্ন জোটানোই দায়। বাঁচার মতো মজুরির দাবিতে রাস্তায় নামলে জোটে রাবার বুলেট আর লাঠিপেটা। অর্থনীতির আরেক শক্তিশালী স্তম্ভ প্রবাসী শ্রমিকরা। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে অমানবিক পরিশ্রম করে তারা রেমিট্যান্স পাঠান, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের মূল জোগানদাতা। কিন্তু প্রবাসে তারা শিকার হন প্রতারণা ও অবহেলার। অনেকেই কফিনবন্দি হয়ে ফেরেন, যাদের মৃত্যুঝুঁকি বা সুরক্ষার নিশ্চয়তা রাষ্ট্র আজও দিতে পারেনি। অন্যদিকে রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে দেশের মানুষের অন্ন জোগান দেওয়া কৃষি শ্রমিকরা সবচেয়ে অবহেলিত। ফসলের ন্যায্যমূল্য তো দূরের কথা, অমানুষিক পরিশ্রম করেও তাদের সন্তানদের পুষ্টিকর খাবার জোটে না।

প্রান্তিক পর্যায়ে বঞ্চনার নির্মম উদাহরণ চা শ্রমিকরা। দেড় শতাব্দী ধরে এক প্রকার দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ তারা। প্রতিদিন মাত্র ১৭০ টাকার বিনিময়ে মাইলের পর মাইল পাহাড়ি ঢালে কাজ করেন। জরাজীর্ণ কুঁড়েঘরে বসবাস করা এই মানুষগুলোর ভূমির অধিকারটুকুও নেই, শিক্ষা ও চিকিৎসায় তারা যোজন যোজন পিছিয়ে। মেগা প্রকল্প আর বহুতল নগরী গড়ে তুলছেন যে নির্মাণ শ্রমিকরা, তাদের জীবনেরও কোনো নিরাপত্তা নেই। সেফটি বেল্ট বা হেলমেটের অভাবে ওপর থেকে পড়ে প্রায়শই তাদের মৃত্যু হয়, পরিবার পায় সামান্য ক্ষতিপূরণ। একই মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শ্রমিকরা। বিষাক্ত রাসায়নিক আর ভারী লোহার নিচে চাপা পড়ে পঙ্গুত্ববরণ বা ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়াই যেন তাদের নিয়তি। আধুনিক দাসত্বের আরেক প্রতিচ্ছবি ইটভাটা শ্রমিকদের জীবনে। দাদনের ফাঁদে পড়ে পরিবারসহ তারা দিনের পর দিন অমানবিক খাটুনি খাটেন। অন্যদিকে দেশের চামড়া শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা ট্যানারি শ্রমিকরা সুরক্ষাসামগ্রী ছাড়াই বিষাক্ত রাসায়নিকের ভেতর খালি হাতে কাজ করে অকালেই কর্মক্ষমতা হারান।

শহরের জীবনে অপরিহার্য হওয়া সত্ত্বেও চরম অবহেলিত পরিবহন শ্রমিকরা। নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ছাড়াই তাদের দিনে ১৫-১৮ ঘণ্টা স্টিয়ারিং ধরতে হয়। মালিকপক্ষের চাপ, চাঁদাবাজি এবং পুলিশি হয়রানিতে তাদের জীবন অতিষ্ঠ। দুর্ঘটনার দায় তাদের ঘাড়ে চাপানো হলেও নিয়োগপত্র বা প্রাতিষ্ঠানিক অধিকার উপেক্ষিতই থাকে। চার দেয়ালের আড়ালে গুমরে কাঁদে গৃহকর্মীদের জীবন। শ্রম আইনের আওতায় না থাকায় কাজের নির্দিষ্ট সময় নেই, বেতন সামান্য এবং তারা প্রায়ই নির্যাতনের শিকার হন। রোদ-বৃষ্টিতে প্যাডেল ঘুরিয়ে শহর সচল রাখা রিকশাচালকের একদিনের অসুস্থতা মানেই পরিবারের উপবাস। তাদের জন্য কোনো সামাজিক সুরক্ষা নেই। শহরের ময়লা পরিষ্কার করে আমাদের সুস্থ রাখা পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা হরিজন সম্প্রদায় চরম বৈষম্যের শিকার। তাদের বেতন সামান্য ও বাসস্থানের পরিবেশ মানবেতর।

গ্রাম ও উপকূলীয় অঞ্চলের শ্রমিকদের চিত্র আরও ভয়াবহ। প্রখর রোদে চামড়া পুড়িয়ে লবণ উৎপাদনকারী চাষিরা মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপটে ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত থাকেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উত্তাল সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলে ও মৎস্য শ্রমিকদের নিত্যসঙ্গী জলদস্যুদের আক্রমণ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ। মহাজনের ঋণের জালে আটকে থাকায় ইলিশ ধরেও তাদের পাতে ইলিশ জোটে না। ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা তাঁত শ্রমিকরা সুতা-রঙের অতিরিক্ত দাম ও পুঁজির অভাবে অস্তিত্ব সংকটে। দারিদ্র্যের কষাঘাতে অনেকেই পেশা ছাড়ছেন। সোনালি আঁশের অতীত গৌরব হারানো পাটকল শ্রমিকদের গল্পটা কেবলই হাহাকারের। বছরের পর বছর বকেয়া বেতন, কারখানা বন্ধ হওয়া এবং রাস্তায় নেমে আন্দোলন করাই যেন তাদের ললাটলিখন।

শহরের দোকানপাটে হাসিমুখে সেবা দেওয়া কর্মচারীদের কাজের নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। দৈনিক ১২-১৪ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে কাজ করার পরও সাপ্তাহিক ছুটি বা চাকরির নিশ্চয়তা থাকে না। গ্রামীণ ও শহুরে অবকাঠামো নির্মাণে মাটি কাটা দিনমজুরদের হাড়ভাঙা খাটুনির বিপরীতে মজুরি এতটাই নগণ্য যে, ৪০ বছর বয়সেই শরীর কর্মক্ষমতা হারায়। ফুটপাতে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সংসার চালানোর যুদ্ধ করা ভাসমান হকারদের উপার্জন চলে যায় মাস্তান ও অসাধু পুলিশ সদস্যদের পকেটে। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য আমাদের শিশু শ্রমিকদের জীবন। ওয়েল্ডিং কারখানা, গ্যারেজ, ইটের ভাটা বা বাসাবাড়িতে চরম দারিদ্র্য তাদের হাতে তুলে দিয়েছে হাতুড়ি আর ঝাড়ু। শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত এই শিশুদের ভবিষ্যৎ শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যায়।

বাংলাদেশ আজ যে অর্থনৈতিক উচ্চতায় পৌঁছেছে, তা মেহনতি মানুষের নিরন্তর সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ফল। তাদের এই অবদানের স্বীকৃতি কেবল মুখে দিলে হবে না, তা দিতে হবে রাষ্ট্রীয় নীতি, ন্যায্য মজুরি ও মানবিক মর্যাদার মাধ্যমে। শ্রমিকের রক্তে রঞ্জিত অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। যেদিন এদেশের প্রতিটি শ্রমিক ঘামের ন্যায্য মূল্য পাবে, অনাহারে থাকতে হবে না, বেতনের দাবিতে রক্ত দিতে হবে না কেবল সেদিনই আমরা বলতে পারব, আমাদের অর্থনীতি উন্নত ও মানবিক। তার আগ পর্যন্ত এই প্রবৃদ্ধির গল্প কেবলই একতরফা, যার আড়ালে চাপা পড়ে লাখো শ্রমিকের বোবা কান্না।

লেখক : শিক্ষার্থী, স্নাতক, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ।