জাফর আহমাদ
আল্লাহ তা’আলা বলেন, “আর যে ব্যক্তি আমার ‘যিকর’ (কুরআন) থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে তার জন্য দুনিয়ার জীবন সংকীর্ণ জীবন এবং কিয়ামতের দিন আমি তাকে অন্ধ করে উঠাবো। সে বলবে, “হে আমার রব! দুনিয়ায় তো আমি চক্ষুস্মান ছিলাম কিন্তু এখানে আমাকে অন্ধ করে উঠালে কেন? আল্লাহ বলবেন,“হাঁ, এভাবেই তো আমার আয়াত যখন তোমার কাছে এসেছিল, তখন তুমি তাকে ভুলে গিয়েছিলে এবং সেভাইে আজ তোমাকেও ভুলে যাওয়া হচ্ছে।” (সুরা ত্বাহা : ১২৪-১২৬)
যারা কুরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তাদের দুনিয়ার জীবন সংকীর্ণ হয়ে যায়। সংকীর্ণ জীবন হবার মানে এই নয় যে, দুনিয়ায় তাকে অভাব অনটনের মধ্যে জীবন যাপন করতে হয়। বরং এর অর্থ হচ্ছে এই যে, এখানে মানসিক স্থিরতা লাভ করতে পারবে না। কোটিপতি হলেও মানসিক অস্থিরতায় ভুগবে। সাত মহাদেশের পরাক্রমশালী স¤্রাট হলেও মানসিক অস্থিরতা ও অতৃপ্তির হাত থেকে মুক্তি পাবে না। তার পার্থিব সাফল্যগুলো হবে হাজারো ধরনের অবৈধ কলাকৌশল অবলম্বনের ফল। এগুলোর কারণে নিজের বিকেসহ চারপাশের সমগ্র সামাজিক পরিবেশের প্রত্যেকটি জিনিসের সাথে লাগাতার দ্বন্দ্ব চলতে থাকবে। যার ফলে সে কখনো মানসিক প্রশান্তি ও প্রকৃত সুখ লাভ করতে পারবে না। এ তো দুনিয়ার অবস্থা আর আখিরাতে তাকে অন্ধ করে উঠানো হবে। কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে তাদের তীক্ষè দৃষ্টির কথা বলা হয়েছে কিন্তু আলোচ্য আয়াতে অন্ধ করে তোলা হবে বলা হয়েছে। মনে হচ্ছে, আল্ল্াহর অসীম ক্ষমতাবলে তারা আখিরাতের ভয়াবহ দৃশ্য এবং নিজেদের দৃস্কৃতির ফল খুব ভালোভাবেই দেখবে কিন্তু তাদের দৃষ্টি শক্তি শুধুমাত্র এগুলো দেখার যোগ্যতা সম্পন্ন হবে। বাদবাকি অন্যান্য দিক থেকে তাদের অবস্থা হবে এমন অন্ধের মতো যে নিজের পথ দেখতে পায় না। যার হাতে লাঠিও নেই, হাতড়ে চলার ক্ষমতাও নেই, প্রতি পদে পদে হোঁচট খাচ্ছে, বুঝতে পারছে না সে কোন দিকে যাবে এবং নিজের প্রয়োজন কিভাবে পূর্ণ করবে। নি¤œলিখিত শব্দাবলীর মাধ্যমে এ অবস্থাটিকে তুলে ধরা হয়েছে।“যেভাবে তুমি আমার আয়াতগুলো ভুলে গিয়েছিলে ঠিক তেমনিভাবে আজ তোমাকে ভুলে যাওয়া হচ্ছে।” অর্থাৎ তুমি কোথায় কোথায় হোঁচট খাচ্ছো, আঘাত পাচ্ছো এবং কেমনতর বঞ্চনার শিকার হচ্ছো আজ তার কোর পরোয়াই করা হবে না। কেউ তোমার হাত ধরবে না, তোমার অভাব ও প্রয়োজন পূর্ণ করবে না এবং তোমার কোনরকম দেখাশুনা করা হবে না। তুমি চরম উপেক্ষা, অবজ্ঞা ও বিস্মৃতির অতল তলে নিক্ষিপ্ত হবে।
তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেন, “তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেনি, নাকি তাদের মনের ওপর তালা লাগানো আছে?”(সুরা মুহাম্মদ:২৪) অর্থাৎ হয় এসব লোক কুরআন মাজীদ সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণা করে না। কিংবা চিন্তা-ভাবনা করার চেষ্টা করে কিন্তু তার শিক্ষা এবং অর্থ ও তাৎপর্য তাদের মনের গভীরে প্রবেশ করে না। কেননা, তাদের হৃদয়-মনে তালা লাগানো আছে। বলা হয়েছে, “মনের ওপর তালা লাগানো আছে” একথাটির অর্থ হচ্ছে এমন তালা লাগানো আছে যা ন্য্য়া ও সত্যকে চিনে না এমন লোকদের জন্য নির্দিষ্ট। অথচ এই শিক্ষার মধ্যেই ছিল তাদের জন্য সতর্ক বার্তা এবং সঠিক পথ নির্দেশনা। কিন্তু তা নিয়ে তারা কখনো ভালোভাবে বা শিক্ষা গ্রহণের নিমিত্তে তা পর্যালোচনা করেনি। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন, “এটি মানব জাতির জন্য একটি সুস্পষ্ট সতর্কবাণী এবং যারা আল্লাহকে ভয় করে তাদের জন্য পথনির্দেশ ও উপদেশ।” (সুরা আলে ইমরান : ১৩৮)
কুরআনকে অবহেলার আাখিরাতে কঠিন শাস্তি সম্পর্কে আল কুরআনেরই বিভিন্ন স্থানে বর্ণিত হয়েছে। যেমন; আল্লাহ তা’আা বলেন,“(হে মুহম্মদ! এদেরকে সেই দিন সম্পর্কে হুঁশিয়ার করে দাও) যেদিন আমি প্রত্যেক উম্মাতের মধ্যে তাদের নিজেদের মধ্য থেকে একজন সাক্ষী দাঁড় করিয়ে দেবো, যে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ দিবে এবং এদের বিরুদ্ধে সাক্ষ দেবার জন্য আমি তোমাকে নিয়ে আসবো। (আর এ সাক্ষ্যের প্রস্তুতি হিসেবে) আমি এ কিতাব তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যা সব জিনিস পরিস্কারভাবে তুলে ধরে এবং যা সঠিক পথনির্দেশনা, রহমত ও সুসংবাদ বহন করে তাদের জন্য যারা আনুগত্যের শির নত করে দিয়েছে।” (সুরা আন নাহল:৮৯) অর্থাৎ কুরআন এমন একটি গ্রন্থ যা প্রত্যেকটি জিনিস পরিস্কারভাবে তুলে ধরে, যার ওপর হিদায়াত ও গোমরাহী এবং লাভ ও ক্ষতি নির্ভর করে, যা জানা সঠিক পথে চলার জন্য একান্ত প্রয়োজন এবং যার মাধ্যমে হক বাতিলের পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। যারা আজ এ কিতাবটি মেনে নিবে এবং আনুগত্যের পথ অবলম্বন করবে এ কিতাব জীবনের সব ক্ষেত্রে তাদেরকে সঠিক পথ দেখাবে, একে অনুসরণ করে চলার কারণে তাদের প্রতি আল্লাহর রহমত বর্ষিত হবে এবং এ কিতাব তাদেরকে এ সংবাদ দেবে যে, চুড়ান্ত ফায়সালার দিন আল্লাহর আদালত থেকে তারা সফলকাম হয়ে বের হয়ে আসবে। অন্যদিকে যারা এ কিতাব মানবে না তারা যে কেবল হিদায়াত ও রহমত থেকে বঞ্চিত হবে তাই নয় বরং কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহর নবী তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে দাঁড়াবেন তখন এ দলিলটিই হবে তাদের একটি জবরদস্ত প্রমাণ। কারণ নবী একথা প্রমাণ করে দিবেন যে, তিনি তাদেরকে এমন জিনিস দিয়েছিলেন যার মধ্যে হক ও বাতিল এবং সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে বর্ণনা করে দেয়া হয়েছিল। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন,“বড়ই বরকত সম্পন্ন তিনি যিনি তার বান্দার প্রতি এ ফুরকান নাজিল করেছেন যাতে সে সারা বিশ^বাসীর জন্য সতর্ককারী হয়। তাঁর বান্দার ওপর নাযিল করেছেন।” (সুরা ফুরকান : ১)
কুরআন মাজীদের অপর নাম ফুরকান। ফুরকান এর শব্দমূল হচ্ছে, ফা, রা ও ক্বাফ অক্ষরত্রয়। এর অর্থ হচ্ছে দু’টি জিনিসকে আলাদা করা। অথবা একই জিনিসের অংশ আলাদা আলাদা হওয়া। কুরআন মাজীদের জন্য এ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে পার্থক্যকারী হিসাবে অথবা যার মধ্যে পার্থক্য করা হয়েছে অর্থে। অথবা এর উদ্দেশ্য হচ্ছে অতিরঞ্জন। অর্থাৎ পৃথক করার ব্যাপারে এর পারদর্শিতা এতই বেশী যেন সে নিজেই পৃথক। যদি একে প্রথম ও তৃতীয় অর্থে নেয়া হয় তাহলে এর সঠিক অনুবাদ হবে মানদ-, সিদ্ধান্তকর জিনিস ও নির্ণায়ক। আর যদি দ্বিতীয় অর্থে নেয়া হয় তাহলে এর অর্থ হবে পৃথক পৃথক অংশ সম্বলিত এবং পৃথক পৃথক সময়ে আগমনকারী অংশ সম্বলিত জিনিস। কুরআন মাজীদ এ দু’টি দিক দিয়েই আল ফুরকান বলা হয়েছে। বিশ^বাসীর জন্য সতর্ককারী মানে সাবধান বাণী উচ্চারণকরী এবং গাফলতি ও ভ্রষ্টতার অশূভ ফলাফলের ভীতি প্রদর্শনকারী।
আল্লাহ তা’আলা বলেন, “আর এ কুরআন আমার কাছে পাঠানো হয়েছে অহীর মাধ্যমে, যাতে তোমাদের আর যার যার কাছে এটি পৌঁছে যায় তাদের সবাইকে আমি সতর্ক করি। সত্যিই কি তোমরা এমন সাক্ষ্য দিতে সক্ষম যে, আল্লাহর সাথে আরো ইলাহও আছে? বলে দাও আমি তো কখনই এমন সাক্ষ্য দিতে পারি না। বলো, আল্লাহ তো একজনই এবং তোমরা যে শিরকে লিপ্ত রয়েছো আমি তা থেকে সম্পুর্ণ মুক্ত।” (সুরা আনআম : ১৯) অর্থাৎ যাদের কাছে কুরআনের জ্ঞান রয়েছে, যারা কুরঅনকে জানে এবং মানে তারা দি¦তীয় ইলাহকে প্রত্যাখ্যান করে। তদের অন্তর, চক্ষু ও কান কুরআনের আলোয় আলোকিত থাকে। ফলে তারা সবকিছু দেখতে পায়। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন,“যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি তারা এ বিষয়টি এমন সন্দেহাতীতভাবে চেনে যেমন নিজেদের সন্তানদেরকে চেনার ব্যাপরে তারা সন্দেহের শিকার হয় না। কিন্তু যারা নিজেরাই নিজেদেরকে ক্ষতির মধ্যে ঠেলে দিয়েছে তারা এ কথা মানে না।”(সুরা আনআম : ২০) অর্থাৎ যারা আল কুরআনের জ্ঞান রাখে, তারা সন্দেহাতীতভাবে এ সত্যটি জানে ও উপলব্ধি করে যে, আল্লাহ একক সত্তা এবং তাঁর প্রভুত্বে ও কর্তৃত্বে আর কেউ শরীক নয়। যেমন কারোর ছেলে অন্যান্য ছেলেদের ভীড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকলেও সে তাকে চিনে নেয়, ঠিক তেমনি যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের জ্ঞান রাখে, সে ইলাহ কর্তৃত্ব ও উপাস্য হবার ব্যাপারে মানুষের অসংখ্য আকীদা, বিশ^াস ও মতবাদের মধ্যে থেকে কোন প্রকার সন্দেহ সংশয় ছাড়াই প্রকৃত সত্যটি সহজেই চিনে নেয়।
পক্ষান্তরে যারা কিতাবের জ্ঞান রাখে না, তারা নিজেরাই নিজেদেরকে ক্ষতির মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। ফলে তারা আল্লাহর একক কর্তৃত্বে সন্দীহান। কারণ তাদের ভেতরটা পুরোপুরি অন্ধকার, সত্য কখনো তারা দেখতে পায় না। ইবনে আব্বাস রা: হতে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ সা: বলেন: যার হৃদয়ে কুরআনের কিছুই নেই সে বর্জিত বা পরিত্যক্ত ঘরের মতো। (জামে তিরমিযি : ২৯১৩, কিতাবুল ফাযায়েলে কুরআন আন রাসুলিল্লাহ, পরিচ্ছদ: কুরআন পাঠকারীর অবস্থান, মিশকাত : ২১৩৫, হাদীসটি সহীহ) এদের অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেন, “বিদ্যুৎ চমকে তাদের অবস্থা এই দাড়িয়েছে যেন বিদুৎ শিগগীর তাদের দৃষ্টিশক্তি ছিনিয়ে নিবে। যখন সামান্য একটু আলো তারা অনুভব করে তখন তার মধ্যে তারা কিছুদূর চলে এবং যখন তাদের ওপর অন্ধকার ছেয়ে যায় তারা দাঁড়িয়ে পড়ে।” (সুরা বাকারা : ২০)
সুতরাং দুনিয়ায় সম্মােেনর সাথে বাঁচতে হলে এবং আখিরাতের মুক্তির জন্য কুরআন পড়–ন, কুরআন বুঝুন এবং কুরআন অনুযাীয় জীবন ব্যবস্থা গড়ে তুলুন। আল্লাহ তা’আলা সুরা তাকবিরে কুরআনের মাহাত্ম সম্পর্কে বর্ণনা করার পর অত্যন্ত আবেগঘন ভাষায় বলেছেন,“ কজেই তোমরা কোথায় যাচ্ছো? এটা তো সারা জাহানের অধিবাসীদের জন্য একটি উপদেশ। তোমাদেও মধ্য থেকে এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য যে সত্য সরল পথে চলতে চায়।”(সুরা তাকবির:২৬-২৮) এ কিতাবটি সারা দুনিয়ার মানুষের জন্য উপদেশ কিন্তু এর থেকে ফায়দা একমাত্র তারাই হাসিল করতে পাওে যারা নিজেরা সত্য সরল পথে চলতে চায়। এ থেকে উপকৃত হবার জন্য মানুষের সত্য সন্ধানী ও সত্য প্রিয় হওয়া প্রথম শর্ত।
লেখক : ব্যাংকার এবং প্রাবন্ধিক।