সংগ্রাম ডেস্ক
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দাফনকে কেন্দ্র করে গতকাল শনিবার থেকে কয়েক দিনের রাষ্ট্রীয় শোক কর্মসূচি শুরু হয়েছে। জাতীয় পতাকায় মোড়ানো খামেনির কফিনের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে রাজধানী তেহরানে লাখ লাখ মানুষ জড়ো হয়েছে। শোকাহত জনতা বুক চাপড়ে শোক প্রকাশের পাশাপাশি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের স্লোগান দিচ্ছে। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, তাসনিম নিউজ, আল-জাজিরা।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধের শুরুর দিকে এক বিমান হামলায় নিহত হন ৮৬ বছর বয়সী খামেনি। তার মৃত্যু ইরানের ইসলামী শাসনব্যবস্থা এবং নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির নেতৃত্বকে আরো সুসংহত করার সুযোগ এনে দিতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
এমন সময়ে এই শোকানুষ্ঠান শুরু হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধের স্থায়ী অবসান নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে ইরান হরমুজ প্রণালীর ওপর নিজের প্রভাবকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। একইসাথে ইসরাইল আবারো হামলা চালাতে পারেÑ এমন আশঙ্কাও পুরোপুরি কাটেনি।
অনুষ্ঠানস্থল থেকে ইরানের প্রধান আলোচক কাজেম গারিবাবাদি ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যকে সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালীতে যৌথ টহলের সম্ভাবনা নিয়ে তাদের মন্তব্য উত্তেজনা আরো বাড়াতে পারে।
একই হামলায় নিহত খামেনির পরিবারের সদস্যদের কফিনও তার কফিনের পাশে রাখা হয়। কফিনগুলো দেখে অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। কেউ কেউ ‘আমাদের কথা একটাইÑ প্রতিশোধ, প্রতিশোধ’ স্লোগান দেন। অনেকের হাতে ছিল ব্যানার ও পতাকা।
দাফন অনুষ্ঠান উপলক্ষে তেহরানজুড়ে বিভিন্ন বিলবোর্ডে শোভা পাচ্ছে খামেনির প্রতিকৃতি। শিয়া রীতিতে শোক প্রকাশের অংশ হিসেবে অনেক পুরুষকে বুক চাপড়াতেও দেখা গেছে।
মাসুমেহ মোহাম্মাদি নামে এক শোকাহত ব্যক্তি বলেন, ‘ইমাম খামেনি ছিলেন আমাদের হৃদয়, আমাদের পিতা, আমাদের সবকিছু। এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না, তাকে শহীদ করা হয়েছে। তার মৃত্যুর প্রতিশোধ না নেয়া পর্যন্ত আমরা থামব না।’
প্রতিরোধের বজ্রশপথ
ইসনার প্রতিনিধিরা এই বিদায় অনুষ্ঠানে আসা সাধারণ মানুষের কাছে তিনটি প্রশ্ন রেখেছিলেন। আজ যদি শহীদ নেতার সাথে কথা বলার সুযোগ পেতে তবে কী বলতে? ইমাম খোমেনি আর তার সবচেয়ে বড় অবদান বা ঐতিহ্য কী বলে মনে করো? আর আজ এই বিদায়যাত্রায় এসে তোমার কেমন লাগছে? মানুষের সেই মনের কথাগুলোই উঠে এসেছে তাদের মুখে।
তেহরানের গ্রান্ড মোসাল্লার ময়দানে ভোর থেকেই জড়ো হতে শুরু করেছিলেন লাখ লাখ মানুষ। ইরানের ছাত্র বার্তা সংস্থা ইসনা জানিয়েছে, হাতে ইরান আর আঞ্চলিক প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর পতাকা, ইমাম হোসেনের শাহাদতের স্মরণে আবেগময়বার্তা, ফুলের ডাল আর তাদের শহীদ নেতার ছবি। বিদায় আর জানাযার এই দিনে প্রিয় নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন তারা। কান্না, ক্ষোভ, স্লোগান আর নতুন করে নেয়া শপথের এক মহাসমুদ্র যেন তৈরি হয়েছিল সেখানে। শোকার্ত মানুষগুলো তাদের নিজেদের ভাষায় প্রকাশ করছিলেন কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসা আর লড়াইয়ের পথ ধরে রাখার অঙ্গীকার।
শহীদ নেতা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সাধারণ মানুষের সাথেই ছিলেন
শহীদ নেতা ও সর্বোচ্চ নেতার ছবি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণী ২১ মার্চের ঘটনা মনে করিয়ে দিয়ে বললেন, ‘সারা দুনিয়ার কাছে আজ এটা প্রমাণ হয়ে গেছে যে আমাদের নেতা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ইরান ছেড়ে যাননি, তিনি তার দেশের মানুষের সাথেই দাঁড়িয়েছিলেন। আমরা এর জন্য গর্বিত। আমরা সবসময় বলতাম আমরা নেতার জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতে পারি, কিন্তু এবার প্রমাণ হলো খোদ নেতাই নিজের জীবন দেশের মানুষের জন্য উৎসর্গ করে গেলেন।’
আজকের বার্তা একটাই, প্রতিরোধ
গলায় স্কার্ফ জড়ানো আর হাতে ‘ইয়া হুসাইন’ লেখা নিশান নিয়ে অশ্রুসজল চোখে এক মধ্যবয়সী ব্যক্তি বললেন, ‘আমাদের বুকটা ফেটে যাচ্ছে। আমরা কখনো ভাবিনি যে কোনোদিন শহীদ নেতার জানাজায় আমাদের আসতে হবে। আমাদের ইচ্ছা ছিল তিনি নিজে আমাদের হাত ইমাম মাহদির হাতে সঁপে দেবেন।’ তিনি বুক কাঁপানো কণ্ঠে জোর দিয়ে বললেন, ‘যারা আমার কথা শুনছেন তাদের সবাইকে আমি বলতে চাই, আমরা আমাদের শহীদ নেতার পথ থেকে এক চুলও নড়ব না। ইসলামের জন্য, মুসলমানদের জন্য আমাদের শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত প্রিয় নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতবা খামেনির পেছনে আমরা ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকব। আজ এই জানাজার বার্তা একটাই, তা হলো প্রতিরোধ, প্রতিরোধ আর প্রতিরোধ।’
ইরানের পতাকা আর শহীদ নেতার ছবি বুকে চেপে এক কিশোরী ইসনা প্রতিনিধিকে বললেন, ‘আজ আমি এখানে এসেছি আমার শহীদ নেতার প্রতি নতুন করে শপথ ব্যক্ত করতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরাইল ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত আমি আমার এ পথই অবিচল থাকব।’
হাতে একটি সূর্যমুখী ফুল আর শহীদ নেতার ছবি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক তুরুণী বলেন, ‘আজ আমি শহীদ নেতার প্রতি আমার গভীর কৃতজ্ঞতা আর সমর্থন জানাতে এসেছি। তিনি যখন বেঁচে ছিলেন, আমরা হয়তো তাকে সেভাবে মূল্যায়ন করতে পারিনি যেভাবে করা উচিত ছিল। আজ আমি এখানে এসেছি তার সমস্ত ত্যাগ আর পরিশ্রমের জন্য তাকে একটা ধন্যবাদ দিতে।’
কফিনের ওপর আরবিতে কী লেখা
ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির প্রতি সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা ও আশপাশের সড়কগুলো লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠেছে। ইরানের আধা সরকারি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সর্বোচ্চ নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে রাজধানীতে লাখ লাখ মানুষ সমবেত হয়েছেন। তাদের জন্য জায়গা করে দিতে গ্র্যান্ড মোসাল্লার দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে। খামেনির কফিনে আরবি হরফে লেখা দেখা যায়- যার বাংলা অনুবাদ হলো- ‘আল্লাহ আপনার ওপর রহমত বর্ষণ করুন, ইয়া আবা আবদিল্লাহ (হে আব্দুল্লাহর পিতা)। ‘আবু আবদিল্লাহ’ হলো- ইমাম হুসাইন (রা.) এর প্রসিদ্ধ একটি উপাধি। ইরানের শিয়া ধর্মাবলম্বীরা তাদের রাষ্ট্রীয় বা সামরিক জানাজা, শোকানুষ্ঠান কিংবা আশুরা-সংক্রান্ত অনুষ্ঠানে এই ধরনের বাক্য ব্যবহার করে থাকেন। তা ছাড়া শিয়া ঐতিহ্যে কারবালার স্মরণে এই বাক্যটি খুবই প্রচলিত।
অংশ নিতে চান মোজতবা খামেনি
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তার বাবা ও পূর্বসূরি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কয়েকদিনব্যাপী শেষ বিদায়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে চান, তবে আনুষ্ঠানিকতার কোন পর্যায়ে উপস্থিত হবেন তা এখনও স্পষ্ট নয়। পত্রিকাটির কাছে ইরানি সূত্রগুলো দাবি করেছে, মোজতবা খামেনি কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন যে তিনি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে চান। তবে ইসরায়েল তাকে হত্যার চেষ্টা করতে পারে বা তিনি যেখানে আত্মগোপনে আছেন, সেই অবস্থান শনাক্ত করতে পারে এমন নিরাপত্তা শঙ্কায় এখন পর্যন্ত তার এই অনুরোধ নাকচ করা হয়েছে। কর্মকর্তাদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ৯ জুলাই বাবার দাফনে উপস্থিত থাকতে চান মোজতবা খামেনি। আরও উল্লেখ করেছে, যুদ্ধের প্রথম দিনে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় নিহত হওয়া তার স্ত্রী, কিশোর ছেলে এবং অন্যান্য স্বজনদের স্মরণে বুধবার আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত ছিলেন না। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই হামলায় গুরুতর আহত হওয়া মোজতবা খামেনির অনুপস্থিতি তাকে ঘিরে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে, তিনি আদৌ ইরানের নেতৃত্ব পরিচালনা করছেন কি না তা নিয়েও আলোচনা বেড়েছে।
খামেনির জানাযায় অংশ না নিতে ১৩ দেশকে চাপ যুক্তরাষ্ট্রের
ইরানের রাজধানী তেহরানে আয়োজিত দেশটির প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লা আলী খামেনির জানাযা ও দাফনের অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশকে অংশ না নিতে ব্যাপক চাপ প্রয়োগ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একটি সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছেন ইরানের সংবাদ সংস্থা। গত শুক্রবার দেওয়া বক্তব্যে ওই জ্যেষ্ঠ সূত্র জানান, গত পাঁচ দিনে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বিভিন্ন দেশকে খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তেহরানে না যাওয়ার জন্য একটি সমন্বিত কূটনৈতিক প্রচারণা চালান।
গত ২৬ জুন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস ও কূটনৈতিক মিশনে পাঠানো একটি গোপন নির্দেশনায় বলেন, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারকে বোঝাতে হবে যে, ইরানের নেতার শেষকৃত্যে অংশগ্রহণকে যুক্তরাষ্ট্র ‘অবন্ধুসুলভ পদক্ষেপ’ হিসেবে বিবেচনা করবে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে পড়তে পারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই আরব কূটনীতিকের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কো রুবিও অন্তত পাঁচটি আরব দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এ ছাড়া আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতরাও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে সতর্ক করে বলেন, তারা যদি শেষকৃত্যে অংশ নেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়ন সহায়তা কমিয়ে দেওয়া হতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, উত্তর আফ্রিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের সম্ভাব্য প্রভাবের আশঙ্কায় শেষকৃত্যে তাদের প্রতিনিধিত্বের স্তর কমিয়ে দেয়।
ওই সূত্রের মূল্যায়ন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে অন্তত ১৩টি দেশ শেষকৃত্যে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে দাঁড়ায়। এর মধ্যে রয়েছে পূর্ব ইউরোপের তিনটি, আফ্রিকার পাঁচটি, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দুটি এবং পূর্ব এশিয়ার দুটি দেশ। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কারণে অংশ নিতে না পারা কয়েকটি দেশ মধ্যস্থতাকারী কিংবা জেনেভা ও নিউইয়র্কে অবস্থিত নিজেদের কূটনৈতিক মিশনের মাধ্যমে ইরানের কাছে দুঃখ প্রকাশ ও সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করে। এ ছাড়া কিছু দেশ তেহরানে নিযুক্ত নিজেদের কূটনীতিকদের অনুষ্ঠানে পাঠানোর প্রস্তাব দিলেও ইরান তা গ্রহণ করেনি।
বাতাসে উড়ছে প্রতিশোধের লাল পতাকা
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাযায় শোকার্ত সমর্থকদের হাতে উঠে এসেছে ‘প্রতিশোধের’ প্রতীক লাল পতাকা। গতকাল শনিবার রাজধানী তেহরানে শত শত মানুষ এই লাল পতাকা নিয়ে শোকমিছিলে অংশ নেন।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ফেলো মোহাম্মদ ইসলামি বলেন, খামেনির অনুসারীরা এই লাল পতাকাকে প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবেই তৈরি করেছেন।
তিনি আরও বলেন, যারা তাদের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে ইরান সরকারের প্রতি তারা স্পষ্ট আহ্বান জানাচ্ছেন।
ইসলামি মনে করিয়ে দেন, খামেনি শুধু একজন রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন না, তাঁর অবস্থান ছিল অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রতীকী।