বিশেষ প্রতিনিধি, রাজশাহী

সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সেবার জন্য দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল। সময়ের ব্যবধানে এর অবকাঠামোগত বিস্তার ঘটলেও ভিতরে ভিতরে নানা সংকট ও সমস্যার ভারে নিজেই যেন টালমাটাল অবস্থার শিকার।

একদিকে রোগীর চাপে বেসামাল অবস্থা হাসাপাতালের। অন্যদিকে সুবিধা বৃদ্ধি পাচ্ছে না। সচল হচ্ছে না বিভিন্ন কার্যক্রম। শয্যা সংখ্যার দ্বিগুণেরও বেশি রোগী। আইসিইউ’র সংকটের কারণে অতি জরুরি সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। জনবল কম থাকায় এবং তদারকির অভাবে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় থাকছে না। হাসপাতালে প্রায়ই চিকিৎসক-নার্স-কর্মী বনাম রোগীর স্বজন বিবাদ-সংঘাত লেগেই থাকছে।

শয্যা-সংকট প্রবল

উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহৎ এই চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান রামেক হাসপাতাল দীর্ঘদিন ধরেই জনবল ও অবকাঠামোগত সংকটে ভুগছে। একসময় ৫০০ শয্যার হাসপাতালটি ২০১৩ সালে ১ হাজার ২০০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও সেই অনুযায়ী জনবল বাড়েনি। এখনো পুরোনো কাঠামোর জনবল দিয়েই হাসপাতাল পরিচালিত হচ্ছে। ফলে ধারণক্ষমতার তিনগুণেরও বেশি রোগীকে চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে চরম চাপের মুখে পড়তে হয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন ওয়ার্ডগুলোতে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার রোগী চিকিৎসা নেন। অথচ শয্যা রয়েছে মাত্র ১ হাজার ২০০টি। এতে অধিকাংশ রোগীকেই বেড না পেয়ে মেঝে ও বারান্দায় গাদাগাদি করে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু ওয়ার্ডগুলোতে পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক। একটি বেডে তিন থেকে চারজন শিশুকে চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে। বহির্বিভাগেও রয়েছে রোগীর উপচে পড়া ভিড়। প্রতিদিন গড়ে সাত থেকে আট হাজার রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত চিকিৎসাসেবা দেয়া হলেও দীর্ঘ লাইনের কারণে অনেক রোগী ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে বাধ্য হচ্ছেন। একজন চিকিৎসককে প্রতিদিন দেড় থেকে দুশো রোগী পর্যন্ত দেখতে হচ্ছে।

আইসিইউ সংকটে ৯১ শিশুর মৃত্যু

রামেক হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) শয্যাসংকটের চিত্র প্রকাশ হয়ে পড়ে এবারের হাম রোগে আক্রান্তদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে। এ কারণে কেবল আইসিইউ’র অপেক্ষায় থেকেই এক মাসে ২২৯ রোগীর মৃত্যু হয়। এর মধ্যে ছিল ৯১টি শিশু। এমন পরিস্থিতিতে সংকট কাটাতে ১০০ শয্যার আইসিইউ স্থাপনের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে অপেক্ষায় থাকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে হাসপাতালে আইসিইউ শয্যার সংখ্যা ৪০টি। এর মধ্যে শিশুদের জন্য ১২, বয়স্কদের জন্য ১৬ ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ১২ শয্যা বরাদ্দ। তবে বর্তমান হামের পরিস্থিতিতে অন্য জায়গা থেকে কমিয়ে শিশু আইসিইউর শয্যার সংখ্যা ছয়টি বাড়ানো হয়। এই ৪০ শয্যার আইসিইউ চলে হাসপাতালের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায়। এই ইউনিটটি এখনো সরকারিভাবে অনুমোদিত নয়। নিয়ম অনুযায়ী এখানে অন্তত ১০ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রয়োজন হলেও সংকট রয়েছে চিকিৎসক ও নার্সের। অন্যান্য কর্মীদের প্রেষণে বা শিক্ষার্থীদের দিয়ে কোনোমতে চালানো হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। জানা গেছে, গত মার্চে শিশু আইসিইউতে ভর্তি ছিল ১১৯টি শিশু। ভর্তির জন্য অপেক্ষমাণ তালিকায় ছিল ৩৮৬টি শিশু। এর মধ্যে ৯১টি শিশু মারা যায়। একই সময়ে বয়স্ক রোগীদের মধ্যে ভর্তি ছিলেন ১৪৩ জন এবং অপেক্ষমাণ তালিকায় ৩০২ জন। তাঁদের মধ্যে মারা যান ৭০ জন। আর প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ভর্তি ছিলেন ১৩৫ জন এবং অপেক্ষায় ছিলেন ৩১২ জন। মারা গেছেন ৬৮ জন।

পড়ে আছে অক্সিজেন প্লান্ট

রামেক হাসপাতালে করোনাকালে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতাস থেকে অক্সিজেন তৈরির জন্য অক্সিজেন জেনারেটর প্ল্যান্ট সরবরাহ করা হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তাদের কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) মাধ্যমে যন্ত্রটি ক্রয় করে। এটির দাম পড়েছিল ২ কোটি ২২ লাখ টাকা। ওই অক্সিজেন জেনারেটর প্ল্যান্ট স্থাপনের ১১ মাস পর থেকে যন্ত্রটি অচল হয়ে পড়ে আছে। কথা ছিল, এখান থেকে প্রায় বিনা খরচে প্রতিঘণ্টায় ৫০০ লিটার বিশুদ্ধ অক্সিজেন উৎপাদন করা হবে। এরপর এক বছরও চলেনি প্লান্টটি। চালুর ১১ মাস পর থেকেই অচল। এখন এই অক্সিজেন প্লান্ট নিয়ে বিপাকে পড়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। চিঠি চালাচালিও করলেও এখন আর পাত্তা দিচ্ছে না ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। অথচ হাসপাতালে গড়ে প্রতিমাসে প্রায় অর্ধকোটি টাকার তরল অক্সিজেন কিনতে হয়। এ বিষয়ে রামেক কর্তৃপক্ষ জানায়, সম্প্রতি মন্ত্রণালয় থেকে প্লান্টটির বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে এবং করণীয় জানতে চাওয়া হয়েছে। তারা একাধিকবার সরেজমিনে দেখে গেছে। মেরামতের আশ্বাস দিয়েছে। তবে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অসহযোগিতার কারণে মেরামত করা হয়নি।

দাঁতের চিকিৎসা চার জায়গায়!

রাজশাহীতে দাঁতের চিকিৎসার জন্য কেবল এক ডেন্টাল ইউনিটই রয়েছে চারটি প্রতিষ্ঠানজুড়ে। অথচ পূর্ণাঙ্গ ডেন্টাল কলেজের নতুন ভবনও প্রায় অব্যবহৃত পড়ে রয়েছে। রামেক-এর অধীন এই ডেন্টাল ইউনিটের শিক্ষার্থীদের ভর্তি কার্যক্রম চলে মূল কলেজ ভবনে। আবার এর আউটডোর রয়েছে রামেক হাসপাতালে। ডেন্টালের রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হয় নগরীর হাতেম খান মহল্লা সংলগ্ন রাজশাহী সদর হাসপাতালে। আর শিক্ষার্থীদের ক্লাশ নেয়া হয় ডেন্টাল কলেজের নিজস্ব ভবনে। এক ডেন্টাল নিয়ে চারটি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা ও শিক্ষা নিয়ে হয়রানির শিকার হতে হয় সংশ্লিষ্টদের।

অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, ভোগান্তি

রোগীরা হাসপাতালে আসেন চিকিৎসা নিতে। কিন্তু এখানে এসে উল্টো স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন রোগী ও স্বজনরা। এমনই চিত্র দেখা যায় রামেক হাসপাতালে। এর সাধারণ ওয়ার্ডগুলোর টয়লেট-ওয়াশরুমগুলো দুর্গন্ধ, নোংরা পরিবেশ ও অপরিচ্ছন্নতার কারণে হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ এই অংশ যেন ‘ময়লার ভাগাড়ে’ পরিণত হয়েছে। দেখা যায়, একাধিক সাধারণ ওয়ার্ডের ওয়াশরুমের দরজা ভাঙা, মেঝেতে জমে আছে নোংরা পানি। দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করায় কমোড ও প্যান থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। বেসিনগুলোর মুখ বন্ধ হয়ে থাকায় পানি উপচে মেঝেতে পড়ছে। কিন্তু রোগী ও স্বজনদের বাধ্য হয়ে এই পরিস্থিতি মেনে নিতে হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর স্বজনরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এখানে সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে যাবে। ওয়াশরুমে ঢোকা তো দূরের কথা, পাশ দিয়ে হাঁটতেও নাক চেপে ধরতে হয়। রোগীরা জানান, এমন পরিস্থিতির কারণে অনেকেই প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও টয়লেট ব্যবহার করতে পারছেন না। এতে বিশেষ করে কিডনি ও ইউরিন সংক্রান্ত রোগীদের ঝুঁকি আরো বেড়ে যায়।

এ প্রসঙ্গে চিকিৎসকদের সংগঠন ‘ড্যাব’-এর রাজশাহীর সভাপতি প্রফেসর ডা. ওয়াসিম হোসেনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, এবিষয়ে বেশকিছু আশার বাণী রয়েছে। স্বাস্থ্যখাতে রাজশাহীর জন্য শীঘ্রই ভাল কিছু আসছে। আগামী দু’মাসের ভেতর রাজশাহী শিশু হাসপাতাল চালু হবে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ১২০০ শয্যার। কিন্তু জনবল রয়েছে অর্ধেক। আগামীতে লজিস্টিক সাপোর্ট বাড়বে এবং সে লক্ষ্যে কাজ শুরু হয়েছে। এছাড়া এই হাসপাতালের জন্য আইসিইউতে ১০০ শয্যার অনুমোদন পাওয়া যাবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মহোদয়ের সাথে সব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।