লক্ষ্মীপুর থেকে সেলিম উদ্দিন নিজামী : লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে এক সঙ্গে মা ও তিন বোনকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে বেঁচে যাওয়া একমাত্র ভাই সিফাত হোসেন। শিফাতের চোখে-মুখে এখন শুধুই হতাশা। এভাবে চিরকালের জন্য মা ও বোনেরা আমাকে ছেড়ে চলে যাবে আমাকে অন্ধকার করে দেবে, তা কে জানত! যে চোখে কিছুদিন আগেও ছিল সুন্দর এক ভবিষ্যতের স্বপ্ন,সেই চোখে এখন শুধুই এক দৃষ্টিহীন শূন্যতা। ঘাতকের নির্মম হাত থেকে কোনমতে প্রাণটা বেঁচে গেলেও শিফাত হারিয়ে ফেলেছে তার বেঁচে থাকার সব আলো তার মা ও তিন বোনকে। হত্যাকারী গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সে বিচার কি ফিরিয়ে দিতে পারবে?
শুক্রবার দুপুর ২টার দিকে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতাল নিহতদের ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে লাশ গুলো হস্তান্তর করা হয়েছে। এঘটনায় রায়পুর থানায় অজ্ঞাত আসামী করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন নিহত শাহীনুর বেগমের বেঁচে যাওয়া ছেলে শিফাত হোসেন। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ঘটনাস্থলে ৪জনের জানাযা শেষে কুমিল্লার হোমনা গ্রামের বাড়িতে দ্বিতীয় জানাযা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। তবে জানাযায় স্থানীয় জামায়াত বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ব্যবসায়ীসহ সর্বস্তরের শত শত মানুষ অংশ নেয়।
পুলিশ ও নিহতদের স্বজনরা জানায়, গত বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা সড়কের আমির হোসেন মাস্টারের ভাড়া বাসা থেকে কর্মস্থলের দিকে বের হন শিফাত। এর পর তাকে মা শাহীনুর বেগম নাস্তা করতে মোবাইলে কল দেন। কিন্তু বাসায় আর যায়নি। এটাই মায়ের সাথে শেষ কথা শিফাতের। এই কথাগুলো বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন তিনি। যে ঘরটা প্রতিদিন মা আর তিন বোনের হাসিকান্না,গল্প আর কলকাকলিতে মুখর থাকত, ঘটনার পর থেকে কর্মস্থল হায়দার এন্টার প্রাইজে চুপচাপ বসে আছে শিফাত। তার চোখের পানি যেন শুকিয়ে গেছে। আত্নীয়-স্বজন কিংবা প্রতিবেশীরা এসে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করলেও সে শুধু শূন্য দৃষ্টিতে থাকিয়ে থাকে। মা-বোনকে হারিয়ে শিফাত কেবল একা হয়নি,সে এক চরম অনিশ্চিত ভবিষ্যৎতের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। এর আগে ২০১৯ সালের ২৫ জুন রায়পুর শহরে বিদ্যুৎ স্পষ্ট হয়ে বাবাকে হারিয়েছেন তিনি। তবে কি কারণে এমন হলো? তাদের তো কোন শত্রু ছিলনা। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে আরো কেউ জড়িত থাকলে, তাদের বের করে শাস্তি নিশ্চিত করার দাবী জানান ১৬ বছরের কিশোর শিফাত হোসেন।
সিফাতের বরাত দিয়ে রায়পুর বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদ বলেন, সকালে সিফাত দোকানে আসে। পরে বেলা ১১টার দিকে তার মা ও বোনদের কুপিয়ে হত্যার খবর আসে। তবে এ হত্যাকান্ড একজনের দারা সম্ভব নয়। এটার সাথে আরো কেউ জড়িত থাকতে পারে। তাদের খোঁজে বের করতে হবে। পাশাপাশি শিফাতের পুরোপুরি দায়িত্ব নিয়েছি। তদন্ত করে দোষীদের সবোর্চ্চ শাস্তি নিশ্চিতের দাবি করেন তিনি। সাইফুল ইসলাম মুরাদের মতো অনেকেই বলেছেন, অন্তর মজুমদার একা চারটি হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটাতে পারেনা। এটার সাথে অন্য কেউ জড়িত থাকতে পারে বলে সন্দেহ এলাকাবাসীর। এই মর্মান্তিক হত্যাকান্ড কোনভাবে মেনে নেয়া যায়না। ভদ্র নম্র স্বভাবের ছিল পুরো পরিবারটি। প্রতিবেশী সকলেই তাদেরকে ভালো জানতেন।
নিহত শাহীনুরের বাবা দাদন মিয়া বলেন, কার কাছে বিচার চাইবো কে বিচার করবে। আমার মেয়ে ও তিন নাতনিদের কোন শক্র ছিলনা। কেন এমন হলো। ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী জানান তিনি। পাশাপাশি নিহত মেয়ে ও তিন নাতনির মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষ বুঝে নিয়ে কুমিল্লার হোমনা উপজেলা নিয়ে নিজ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শাহীন মিয়া বলেন, এঘটনায় থানায় অজ্ঞাত আসামী করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন নিহত শাহীনুর বেগমের বেঁচে যাওয়া ছেলে শিফাত হোসেন। কি কারণে এই হত্যাকান্ডটি ঘটেছে সেটা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে। এ হত্যাকাণ্ডের সাথে আরো কেউ জড়িত আছে কিনা সেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার সকালে রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা আমির হোসেন মাস্টারের বাসায় ঢুকে অন্তর মজুমদার নামে এক হিন্দু যুবক শাহীনুর বেগম ও তার মেয়ে সায়মা আক্তার, ইকরা আক্তার ও শিফা আক্তারকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। এতে করে ঘটনাস্থলেই শাহীনুর বেগম (৪০) ও বড় মেয়ে কলেজ শিক্ষার্থী সায়মা আক্তার (১৮) মারা যান। পরে রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়ার পর মারা যান শিফা আক্তার (৯)। গুরুতর আহত অপর শিক্ষার্থী ইকরা আক্তারকে আশংকাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে সেও মারা যান। এছাড়া ঘাতক অন্তর মজুমদারকে আটক করে গনধোলাই দেয় স্থানীয়রা। পরে তাকে উদ্ধার করে সদর হাসপাতালে নেয়ার পথে সেও মারা যায় বলে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে । অন্তর মজুমদার নোয়াখালী জেলার সুবর্ণচর এলাকার কার্তিক মজুমদারের ছেলে বলে জানা গেছে। সে গত কয়েক বছর ধরে রায়পুরে ভ্রাম্যমাণ ফল ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত।
গণপিটুনিতে নিহতের লাশ দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের কাছে হস্তান্তর
লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মা ও তিন মেয়েকে হত্যার ঘটনায় গণপিটুনিতে নিহত অন্তর মজুমদারের (২৮) লাশ পরিবার নিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর দূর সম্পর্কের চাচাতো ভাই টিটু মজুমদারের কাছে হস্তান্তর করেছে পুলিশ।
শুক্রবার (২৬ জুন) বিকেলে অন্তরের লাশ হস্তান্তর করা হয় বলে রাতে জানিয়েছেন লক্ষ্মীপুর সদর মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. ইয়াকুব।
তিনি বলেন, “অন্তর নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চরজব্বর থানাধীন চরভাটা এলাকার চরবজলুল করিম গ্রামের কার্তিক মজুমদারের ছেলে। তার লাশ নিতে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু, পরিবারের সদস্যরা কোনভাবেই নিতে রাজি ছিলেন না। পরে ওই থানা পুলিশের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের মাধ্যমে নিহতের দূর সম্পর্কের এক চাচাতো ভাইকে আনা হয়। ময়নাতদন্তের পর শুক্রবার বিকেলে তার কাছে অন্তরের লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে।”
১০০ শয্যাবিশিষ্ট লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. অরুপ পাল বলেন, “সুরুতহালের পর নিহত অন্তরের লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। পরে লাশ আমরা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছি।”
রায়পুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহীন মিয়া বলেন, “গণপিটুনিতে অন্তর মজুমদারের মৃত্যুর ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। রায়পুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আমিনুল ইসলাম বাদী হয়ে অজ্ঞাত আসামীদের বিরুদ্ধে মামলাটি করেন।”
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা নদীর পাড় এলাকার আমির হোসেন মাস্টারের পাঁচতলা ভবনের নিচতলার ফ্ল্যাটে ঢুকে শাহিনুর বেগম ও তার তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা করার অভিযোগ ওঠে অন্তর মজুমদারের বিরুদ্ধে। ঘটনার পরপরই স্থানীয় জনতা অন্তরকে ধরে গণপিটুনি দেয়। এতে তারও মৃত্যু হয়।