জুলাই যুদ্ধে অংশ নেওয়া কিশোর আরাফাতসহ সব হত্যার দ্রুত বিচার দাবি করেছেন শহীদ আরাফাতের বাবা মো. শহিদুল ইসলাম। সন্তানের হত্যার বিচার চাইতে গিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। জুলাই নিয়ে দৈনিক সংগ্রামের সাথে আলাপকালে তিনি জানান, স্বৈরাচার সরকারের পতনের পর ৫ অগাস্ট বিকালে আনন্দ মিছিলে গিয়েছিল আরাফাত। সেই সময় আজমপুরে থানার সামনে গুলীবিদ্ধ হন তার ছেলে আরাফাত। এরপর দীর্ঘ চিকিৎসার পর ২২ ডিসেম্বর না ফেরার দেশে চলে যায় কিশোর আরাফাত। পুলিশের বন্দুকের গুলী তার পাঁজরের নিচ দিয়ে ঢুকে পিঠের দিকে বের হয়ে যায়। কয়েকটি হাসপাতালে ঘুরে কুমির্টোলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে চিকিৎসকরা তাকে সিএমএইচে পাঠান। সেখানেই সাড়ে ৪ মাস চিকিৎসাধীন ছিল।

চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে তার বাবা জানান, ঘটনার দিন আরাফাতের বাম পাঁজরে গুলী লাগে। এতে তার ফুসফুস, মেরুদণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গুরুতর আহত আরাফাতকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ নেয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছিল। ভিসা টিকিট সব রেডি ছিল। কিন্তু বিমানে ওঠার তারিখের আগের রাতে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন আরাফাত। কিশোর হলেও আরাফাত জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করতো। তার প্রত্যশা ছিল নতুন বাংলাদেশ দেখবে হুইল চেয়ারে বসে।

শহীদ আরাফাতের বাবা শহিদুল ইসলাম এখন সন্তান হত্যার বিচারের জন্য অপেক্ষায় আছেন। দৈনিক সংগ্রামের সাথে আলাপকালে শহিদুল ইসলাম বলেন, তার প্রবল ইচ্ছা ছিল বেঁচে থাকার। স্কাধীন দেশ দেখে যাওয়ার। শেষ পর্যন্ত বলেছিল যে হুইল চেয়ারে বসে হলেও যেন সে বেঁচে থাকে। শহীদ আরাফাতের বাবার আক্ষেপ যারা এই দেশের জন্য রক্ত দিয়েছে সেই রক্তের সাথে কিছু লোক বেঈমানি করছে। আমার ছেলেসহ অনেক মানুষ শহীদ হয়েেেছ শুধু বাংলাদেশকে সুন্দর করার জন্য। ইনসাফের বাংলাদেশ যাতে গড়ে ওঠে। আমার ছেলের বয়স মাত্র ১২বছর ছিল। তার ভেতর সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার চেতনা ছিল। একবার তার গায়ে ছররা গুলী লাগে। এরপরও দ্বিতীয় বার ৫ আগস্ট সে আবার চলে যায় আন্দোলনে। আনন্দ মিছিলে। ফ্যাসিবাদকে তাড়িয়ে দেওয়ার মিছিলে।

আমরা দেখছি সরকার বলছে এটা করবো ওটা করবো। কিন্তু জুলাই সনদের বাস্তবায়ন হচ্ছে না। আমরা চাই সন্তান হত্যাকারীদের দ্রুত বিচার। তা হচ্ছে না। আমরা আশা করি, এই জুলাইয়ে সব বাস্তবায়ন হবে। তা না হলে আমাদের সন্তানেরা শহীদ হয়েছে। পরবর্তীতে আমরাও রক্ত দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হবো।

শহীদের বাবার প্রশ্ন জুলাই বাস্তবায়নের ব্যাপারে সবাই হাঁতে ভোট দিয়েছে। এখন মানা হচ্ছে না কেন? এটা তো শহীদদের রক্তের সাথে বেঈমানি। যারা এখন সরকারে আছে তারাও বলেছে আমরা জুলাই মেনে নিয়েছি। এখন আর তারা মানছে না। জুলাই না এলে তাদের পাটক্ষেতে থাকা লাগতো। লন্ডন বসে থাকা লাগতো। দেশে আর আসা লাগতো না।

তিনি বলেন, যে ফ্যাসিবাদকে আমরা তাড়িয়েছি তাদের সাথে বর্তমান সরকারের যোগাযোগ আছে। একারণেই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তারা মুখে বলে হাঁ আর কাজের বেলা না।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যারা ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছে তাদের জেল থেকে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। আমি বলবো ফ্যাসিবাদ ফিরিয়ে আনা হলে শহীদদের সাথে গাদ্দারি করা হবে। আমরা সেটা মানবো না। দেশের মানুষ তা মানবে না। এখন আমাদের সন্তান হত্যার বিচার করতে গিয়ে হয়রানি করছে। বিলম্ব করছে। জুলাই হত্যাকাণ্ডের তথ্য-প্রমাণাদি দিয়ে তদন্ত সংস্থাকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করছে শহীদদের পরিবারগুলো। অথচ সন্দেহভাজন হত্যাকারীকে পালিয়ে যেতে সহায়তাসহ বিচারের ধীরগতি আমাদের হতাশ করছে।

ছেলের সাথে শেষ সময়ের স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, আমার ছেলের যখন মৃত্যু আসন্ন তখন সে বলতো বাবা হুইল চেয়ার ব্যবহার করেও আমি বাঁচতে চাই। স্বাধীন দেশটা দেখতে চাই। সে বলতো আমি যেহেতু মারা যাবো আমাকে খেতে দেন। খেয়ে দেয়ে মরি। ডাক্তার প্রথমে তাকে খাবার দাবার দিতে নিষেধ করলেও যখন দেখলেন যে আর তাকে বাঁচানো যাবে না তখন বলেছিলেন যে তাকে খেতে দেন। যা চায়। ডাক্তার বুঝে গিয়েছিল যে তাকে আর বাচানো সম্ভব না। কারণ তার পেটের নাড়িভুঁড়ি সব গুলীতে নষ্ট হয়ে যায়। এজন্য খাওয়া দাওয়া বন্ধ রাখা হয়।

আরাফাতকে বিদেশে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই দুনিয়া থেকে চির বিদায় নেন আরাফাত। যেদিন তার বিদেশ যাওয়ার কথা তার আগের দিন ২২ ডিসেম্বর রাত দশটার দিকে মৃত্যু হয় তার। ভিসা পাসপোর্ট টিকিটসহ সবকিছু রেডি ছিল।