আসিফ আরসালান

গত ১১ জুন বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২০২৭ অর্থ বছরের বাজেট পেশ করেন। বাজেট সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ সমস্ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তাই আমি আর ওগুলোর বিস্তারিত বিবরণে যাচ্ছি না। তবে বাজেট সম্পর্কে আলোচনার পূর্বে বাজেটের আউটলাইন বর্ণনা করা প্রয়োজন। সেটি হলো:-

বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৬.৫ শতাংশ। এ বিশাল বাজেটে ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এ ঘাটতি জিডিপির প্রায় ৩.৬ শতাংশ। বাজেটের অর্থায়ন হবে মূলত রাজস্ব আয় থেকে। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর সংগ্রহ করবে প্রায় ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। প্রশ্ন হলো, এ বিশাল ঘাটতির অর্থায়ন হবে কোত্থেকে? প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তা প্রায় ১.১ লাখ কোটি টাকার বেশি। ব্যাংক ঋণ ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। সঞ্চয়পত্র ১৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে আবার ঋণের সুদ পরিশোধ (উবনঃ ঝবৎারপরহম) ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

বলাবাহুল্য, বিএনপি সরকার প্রায় ২০ বছর পর দেশের বাজেট দিলো। এ দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকায় তাদের যে চিন্তা ধারা সেটি প্রতিফলিত করেছে তারা এই বাজেটে। তাই বিএনপি সরকারের এই বাজেটের প্রধান লক্ষ্য হলো, অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন উৎসাহিত করা এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। সরকার ঘোষণা করেছে যে, আগামী ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার হবে ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। ১ মার্কিন ডলার ১২২ টাকা ধরলে ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার হয় ১২২ লক্ষ কোটি টাকা। ট্রিলিয়ন সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণা নেই। কারণ আমরা সে ব্রিটিশ আমল থেকে শতক, হাজার, অযুত, লক্ষ, নিযুত, কোটি- এভাবে হিসাব জেনে এসেছি। তবুও ট্রিলিয়নের হিসাব বোঝার জন্য বিষয়টিকে এভাবে বলা যেতে পারে।

১ মিলিয়ন সমান ১০ লক্ষ। ১০০ মিলিয়ন সমান ১০ কোটি। ১ হাজার মিলিয়ন সমান ১ বিলিয়ন, অর্থাৎ ১০০ কোটি। আর ১০০০ বিলিয়ন সমান ১ ট্রিলিয়ন। টাকা ও ডলারের বিনিময় হার ১২২ টাকা ধরে ১ ট্রিলিয়ন ডলার সমান ১২২ লক্ষ কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদরা বলেছেন যে, ২০৩৪ সালের মধ্যে যদি অর্থনীতির আকার ১ ট্রিলিয়ন করতে হয় তাহলে সেজন্য যা কিছু প্রস্তুতি সেটা আগামী অর্থ বছর থেকেই শুরু করতে হবে। আগামী অর্থ বছর শুরু হচ্ছে ১লা জুলাই থেকে। অর্থনীতিবিদদের প্রায় ঐক্যবদ্ধ অভিমত হলো, ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি করতে হলে আগামী অর্থ বছর থেকেই জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ১০ শতাংশের ওপর করতে হবে এবং এই ১০ শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি ২০৩৪ সাল পর্যন্ত লাগাতার করতে হবে। কিন্তু আগামী অর্থ বছর জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ শুরুতেই ৩ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কম হচ্ছে। এভাবে চললে, এমনকি প্রতিবছর ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হাসিল করলেও ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি কায়েম হবে না। এ সরকার আরো ঘোষণা করেছে যে, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে ১ কোটি লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। তাহলে সেটিও শুরু করতে হবে আগামী অর্থ বছর থেকে (২০২৬-২০২৭)। সংবাদপত্রে যতটুকু পেলাম, সেখানে আগামী অর্থ বছরে কত মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে সেটি আমার নজরে আসেনি।

প্রস্তাবিত বাজেটে আগামী অর্থ বছরে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪২ হাজার ২৯১ কোটি টাকা। বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিরক্ষা খাতে ৪০ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হলেও সংশোধিত বাজেট ছিল ৪০ হাজার ৫০২ কোটি টাকা। ফলে বিদায়ী অর্থবছরের তুলনায় এবার ১ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। মার্কিন ডলারে প্রস্তাবিত প্রতিরক্ষা বাজেট ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার। পাকিস্তান বাংলাদেশের চেয়ে ধনী নয়। বাংলাদেশের বর্তমান জিডিপি ৪ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার। পাকিস্তানের জিডিপি তার চেয়েও কম। কিন্তু তাদের ডিফেন্স বাজেট ৯ বিলিয়ন ডলার। ভারতের ডিফেন্স বাজেট ৯০ বিলিয়ন ডলার। অবশ্য ভারতের সাথে বাংলাদেশের ডিফেন্স বাজেটের তুলনা করা সমীচীন নয়। কারণ তাদের ভৌগোলিক আয়তন যেমন বাংলাদেশের চেয়েও ২০ গুণ বেশি তেমনি জনসংখ্যাও ১৪৬ কোটি (গত মে মাসের হিসাব অনুযায়ী)। ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক Fluctuate করে, অর্থাৎ ওঠা নামা করে। তাদের কাছে সামরিক ক্ষেত্রে পাল্লা দেয়ার কথা চিন্তা না করলেও আমাদের প্রতিরক্ষাকে Vulnerable রাখা ঠিক হবে না। কতিপয় সমাজ চিন্তক শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ওপর সর্বাধিক বরাদ্দ দেয়ার দাবি করেছেন। এ দাবি যৌক্তিক। কিন্তু সাথে সাথে ডিফেন্স বাজেটও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধি করা উচিত।

বাজেট পেশের ২৪ ঘণ্টা আগেই ১১ জুলাই বাংলাদেশের প্রিন্ট মিডিয়ায় বাজেটের উল্লেখযোগ্য অংশ প্রকাশিত হয়েছে। সেটি দেখেই অর্থনীতিবিদগণ বিভিন্ন রকম মন্তব্য করেছেন। অধিকাংশের মত হলো, বাজেটটি এত বিশাল যে, সেটি বাস্তবায়ন করার সক্ষমতা নিয়ে সংশয় ওঠে। কিন্তু আরেক অংশ মনে করেন যে, বাজেটের আকার বড় না ছোটো সেটি মুখ্য বিষয় নয়। তারা মনে করেন যে, প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়ন করতে গেলে রাজস্ব আহরণের যে টার্গেট ধরা হয়েছে সেটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে কিনা। তাদের মতে, অর্থনীতিকে সচল রাখা গেলে এবং শিল্প ও ব্যাংকিং খাতের বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান করা সম্ভব হলে রাজস্ব আহরণ কঠিন হবে না। তবে এর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। অতীতে সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। প্রকৃত ব্যয়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ব্যয় দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের ঘটনাও ঘটেছে। এসব অনিয়ম বন্ধ করা গেলে এবং প্রকৃত ব্যয় নিশ্চিত করা গেলে বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব নয়।

এ প্রসঙ্গে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ একটি মূল্যবান কথা বলেছেন। তিনি প্রশ্ন রেখেছেন, সরকার রাজস্ব আদায়ের জন্য শুধুমাত্র এনবিআরের ওপর ভরসা করবে কেনো? এনবিআরের বাইরেও নন এনবিআর কর ও রাজস্ব আদায়ের সম্ভাবনা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষসহ (বিআরটিএ) বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব আয় করে। এসব প্রতিষ্ঠানের আয় ও রাজস্ব সংগ্রহে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অর্জিত অর্থ যথাযথভাবে সরকারি কোষাগারে জমা হয়।

বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই শুনে আসছি যে, আমাদের ট্যাক্সনেট অর্থাৎ করজালের পরিসর ক্ষুদ্র। অর্থাৎ ১৮ কোটি লোকের বিশাল জনগোষ্ঠীর এক উল্লেখযোগ্য অংশ ট্যাক্সনেটের বাইরে। সরকারের বিশেষজ্ঞদেরকে ট্যাক্সনেট বাড়াতে হবে। এটি একটি আবশ্যিক শর্ত। তবে খেয়াল রাখতে হবে, এই ট্যাক্সনেট বাড়াতে গিয়ে যেনো প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক দুরাবস্থার শিকার না হন।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডির ডিস্টিংগুইসড ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, প্রস্তাবিত বাজেট ‘চিন্তাশীল বাজেট’। তবে এই বিশাল বাজেট বাস্তবায়নের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল। এ বাজেটে একটি মানবিক অর্থনীতি গড়ার কথা বলা হয়েছে। সেজন্য সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশ যথা যুবসমাজ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা বলা হয়েছে। আবার একই সাথে ডিজিটালাইজেশন এবং ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির বিষয়ও এসেছে। এর মধ্যে আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (এআই) ওপরও জোর দেয়া হয়েছে। একথা অস্বীকার করা যাবে না যে এআই প্রযুক্তিকে অবলম্বন করতেই হবে। তবে সেটি করতে গেলে এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে যে এআই প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে নতুন কর্মসংস্থানের পরিবর্তে যেনো কর্মসংস্থান সংকুচিত না হয়।

এতক্ষণ ধরে আমরা বাজেটের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে অর্থনীতির কিছু টেকনিক্যাল দিক আলোচনা করলাম। আর সেটি না করে উপায় নাই। কারণ বাজেটকে টেকনিক্যাল ভাষায় বলা হয় পাবলিক ফিন্যান্স, যেখানে থাকে ফিসক্যাল এবং মানিটারি পলিসি।

শেষ করার আগে দেখা যাক নিম্নবিত্তরা বাজেট সম্পর্কে কি বলেন। শুধু এবার নয়, অতীতেও বাজেট নিয়ে সমাজের এলিটদের মধ্যে অনেক আলাপ আলোচনা হয়। কিন্তু নিম্নবিত্তরা বাজেট সম্পর্কে যা বলেন, সেটি তাদের ভাষায় নিম্নরূপ:-

‘বাজেট বুঝি না, জিনিসপত্রের দাম কম থাকবো, খাইয়া-পইরা ভালো থাকুম’। একজন সিএনজি চালকের বক্তব্য একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে ছাপা হয়েছে এভাবে, “আমি যেহেতু ড্রাইভার, আমার চাওয়া-পাওয়া কম। আমি চাই, সব জিনিসের দাম কম থাকবো। রাস্তা-ঘাট ভালো থাকবো, যানজট কম থাকবো, শান্তিতে সিএনজি চালামু। বউ-ছাওয়াল নিয়ে ভালো থাকমু, ঋণ-ধার করণ লাগবো না।”

শুধুমাত্র ঐ সিএনজি চালক নন, রিকশাওয়ালা, মুটে মজুর, চাষি, এমনকি কেরানি পিয়নদেরও একই বক্তব্য। আর একটি কথা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাজেটে যতই বলা হোক না কেনো যে অমুক অমুক পণ্যের দাম কমবে, আর অমুক অমুক পণ্যের দাম বাড়বে। বাস্তবে কিন্তু পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির সাথে বাজেটের কোনো সম্পর্ক নেই। বছরের ১২টি মাসেই তো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রীর দাম বেড়েই চলেছে। এজন্য বিক্রেতারা বাজেটের জন্য বসে থাকে না। এক্ষেত্রে ক্রেতা সাধারণ বিক্রেতাদের কাছে জিম্মি। সরকার যত ভালো বাজেটই দিন না কেনো, একটি ভালো সরকারের প্রথম কাজ হবে বাজার নিয়ন্ত্রণ।