• জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের একমাত্র জীবিত আসামী দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক মেজর মোজাফফর হোসেনকে (৭৭) গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস এই ঘটনাটি আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গত ১৫ জুলাই রাতে রাজধানীর বনানী ডিওএইচএসের বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। পরিচয় গোপন করে তিনি ৪৫ বছর পলাতক ছিলেন। তবে দীর্ঘ সাড়ে চার দশক তিনি কোথায় ছিলেন? এতটি বছর আত্মগোপনে থাকার পর হঠাৎ ধরা পড়লেন কিভাবে। ডিবি পুলিশ গোয়েন্দা কার্যক্রমের মাধ্যমে মোজাফফর হোসেনকে শনাক্ত করার কথা বললেও জানা গেল ভিন্ন তথ্য।

জানা গেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর মোবাইল ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। এতে কিছু সন্দেহজনক ফোন নম্বর পায় তারা। নম্বরগুলো শনাক্তের জন্য পুলিশের কাছে পাঠানো হয়। এই সূত্র ধরে পলাতক সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোজাফফর হোসেনকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন বৃহস্পতিবার তাকে ঢাকা সেনানিবাসের মিলিটারি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এর আগে এক-এগারোর সময়ের আলোচিত লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিনকে গত ২৩ মার্চ রাতে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএসের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা ডিবি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা গতকাল শনিবার মোজাফফর হোসেনের গ্রেপ্তার এবং শনাক্তের বিষয়ে এমন তথ্য জানান। অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর সহযোগীকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরের হাতে শনাক্ত হন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পলাতক আসামী মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেন। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর মোবাইল ফোন ফরেনসিক পরীক্ষা করার সময় কিছু সন্দেহজনক নম্বরের খোঁজ পান আইসিটির তদন্ত কর্মকর্তারা। পরে পুলিশ তাদের গোয়েন্দা ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়, নম্বরগুলো পলাতক মেজর মোজাফফর হোসেনের। এর পরই বনানীতে আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর জোহা বলেন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ব্যক্তিগত সচিবকে (পিএস) খুঁজছিলাম। পরে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর মোবাইল ফোনে নম্বর খুঁজতে গিয়ে সন্দেহজনক একটি নম্বর পাই। ওই নম্বর থেকে একাধিকবার কল ও এসএমএস আদান প্রদান করা হয়। ফোনালাপগুলোর সময়কাল ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। পরে দেখা যায়, সিমগুলো ভুয়া নামে নিবন্ধিত। নম্বরগুলো পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠায় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। এ ব্যাপারে পরবর্তী সময়ে পুলিশ নিজেদের মতো কাজ করে। উদ্ঘাটিত হয় মাসুদ উদ্দিনের সঙ্গে একাধিক নম্বর থেকে যোগাযোগ করা এই ব্যক্তি হচ্ছেন জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ৪৫ বছর ধরে পলাতক থাকা সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোজাফফর।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জাানান, ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ওপর সংঘটিত হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া সশস্ত্র সেনা কর্মকর্তাদের একজন হলেন মোজাফফর হোসেন। হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই তিনি দীর্ঘ সাড়ে চার দশক ধরে পলাতক ছিলেন। ১৯৮১ সালের ২৯ মে দুই দিনের সফরে চট্টগ্রাম যান তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। রাতে তিনি চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে অবস্থান করছিলেন। ৩০ মে ভোর আনুমানিক ৪টার দিকে একদল সেনা কর্মকর্তা আচমকা সার্কিট হাউসে হামলা চালায়। সামরিক যানবাহন নিয়ে পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে নির্বিচারে গুলী ছুড়তে ছুড়তে তারা ভবনের দোতলায় রাষ্ট্রপতির কক্ষে প্রবেশ করে। সেখানেই ব্রাশফায়ারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে। রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্নেল এহসান এবং ক্যাপ্টেন হাফিজও ঘাতকদের গুলীতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন। হত্যাকাণ্ডের পর সার্কিট হাউস থেকে লাশ সরিয়ে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার একটি পাহাড়ের পাদদেশে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, কর্নেল এহসান ও ক্যাপ্টেন হাফিজকে গোপনে দাফন করা হয়। ১ জুন সরকারি বাহিনী চট্টগ্রামের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করার পর এই কবরের সন্ধান পায়। এরপর লাশগুলো তুলে প্রথমে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে এবং পরে হেলিকপ্টারযোগে ঢাকায় আনা হয়। শেরেবাংলা নগরের ক্রিসেন্ট লেকের পাশে লাখো মানুষের জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয় জিয়াউর রহমানকে। অন্যদিকে, এই ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানের মূল পরিকল্পনাকারী মেজর জেনারেল আবুল মনজুর হাটহাজারীতে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করলেও পরে সেনা হেফাজতে থাকা অবস্থায় তিনি নিহত হন। এছাড়া অভিযানের সময় নিহত হন আরও কয়েকজন বিদ্রোহী কর্মকর্তা।

সামরিক আদালত ও বিচার

হত্যাকাণ্ড এবং ব্যর্থ অভ্যুত্থানের দায়ে গঠিত একটি সামরিক আদালতে ১৮ জন সেনা কর্মকর্তার বিচার করা হয়। বিচার শেষে ১৩ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে ১২ জনের রায় দ্রুত কার্যকর করা হলেও, আহত এক কর্মকর্তার রায় কার্যকর হয় ঘটনার প্রায় দুই বছর পর। এছাড়া ২০ জন সেনা কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দীর্ঘ ৪৫ বছর পর মোজাফফর হোসেন গ্রেফতার হওয়ার ফলে এই মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামীদের সংখ্যা এখন শূন্যের কোঠায় নেমে এলো।

ডিবির তথ্য

এর আগে মোজাফফরকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে বৃহস্পতিবার ডিএমপির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর থেকে তিনি (মোজাফফর) বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে ছিলেন। বিশ্বস্ত সোর্স ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণ করে গোয়েন্দা বিভাগ তার অবস্থান শনাক্ত করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ডিবির একটি আভিযানিক দল গত বুধবার (১৫ জুলাই) রাত ১০টা ১০ মিনিটে বনানীর একটি বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে আর্মড ফোর্সেস ডিভিশনকে অবহিত করা হয়। পরে বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে ঢাকা সেনানিবাসের মিলিটারি পুলিশের কাছে যথাযথ আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাঁকে হস্তান্তর করা হয়।