গণভোটের রায় ব্যর্থ হলে জনগণ গণতন্ত্র ও নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা হারাবে এবং জনগণ সরকারকে ধিক্কার দেবে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, জনগণের ধিক্কারের পাত্র বিরোধীদল হতে চায় না। এ দায়িত্ব আমরা (বিরোধীদল) নেবো না। এজন্যই আমাদের লড়াই, আমাদের সংগ্রাম।

গতকাল রোববার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আয়োজনে ‘রক্তাক্ষরে জুলাই’ প্রদর্শনী পরিদর্শন শেষে দেয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকারি দল স্বাধীন বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন চায় না, নির্বাচন কমিশন চায় না। আগের ফ্যাসিবাদী আলোকে সবকিছু রাখতে চায়। এজন্য তারা গণভোটের গণরায় মানতে চায় না। আমরা পরিস্কার বলে দিচ্ছি- এ রায় বাংলার জমিনে বাস্তবায়ন হবে, ইনশাআল্লাহ।

তিনি আরও বলেন, জনগণকে অপমান করার সুযোগ কাউকে দেয়া হবে না। ৭০ ভাগ মানুষ যে রায় দিয়েছে, আল্লাহর মেহেরবানীতে তা অবশ্যই বাস্তবায়ন হবে। আমরা সংসদে ও রাজপথে লড়াই করব। দাবি সংসদে আদায় হলে আলহামদুলিল্লাহ, না হলে রাজপথে আন্দোলন করে দাবি আদায়ে বাধ্য করা হবে।

জামায়াতের আমীর বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নে কোনো ছাড় নাই। কোনো ধানাই পানাই মানবো না। আমাদের অনেক লোভ দেখানো হয়েছে-সব ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেছি। জনগণের সাথে আমরা বেইমানি করব না। জনগণের রায়কে অপমান করব না। আর যদি গণভোটের রায় ব্যর্থ হয়-জনগণ গণতন্ত্র ও নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা হারাবে। জনগণ ধিক্কার দেবে, সেই ধিক্কারের পাত্র বিরোধীদল হতে চায় না। এ দায়িত্ব আমরা নেবো না। এজন্যই আমাদের লড়াই, আমাদের সংগ্রাম।

তিনি বলেন, সরকার এখন স্বৈরশাসকের ভাষায় বিভিন্ন কথা বলছে। তাদের চেলাচামুন্ডারা ও বটবাহিনী মানুষের ইজ্জত নিয়ে খেলে। আবার সেই ফ্যাসিবাদ!

জামায়াত আমীর বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আর গণরুম হতে দেয়া হবে না। গণরুম, গেষ্টরুমের কবর হয়ে গেছে চব্বিশে-সেটা আর ফিরে আসবে না। এখন কেউ ফিরিয়ে আনতে চাইলে তাদেরই ফিরিয়ে দেয়া হবে। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে আর এটা হবে না।

তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় এখনো রাজনৈতিক অপচর্চামুক্ত হয়নি। রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক জায়গায় অনেক কিছু করা হচ্ছে। আমরা চুপচাপ আছি বলে মনে করবেন না ঘুমিয়ে গেছি, সতর্ক করেন তিনি।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, জনগণের স্বার্থের সাথে কোনো আপস হবে না। কোনো অপশক্তির কাছে মাথাও নত করা হবে না। দেশীয়, আঞ্চলিক, আন্তর্জাতিক-এটা যাই হোক। যুবকদের প্রত্যাশার, আকাক্সক্ষার বাংলাদেশ গড়ার জন্য বাকী জীবনকে আমরা উজার করে দেবো। যুবকদের সাথে লড়াই করব। যুবকদের সাথে ও সম্মুখভাগে থেকে মুক্তির আন্দোলন চলবে। এ আন্দোলন কেউ বন্ধ করতে পারবে না- প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ওয়াদা করে গেলাম, বলেন তিনি।

এসময় আমীরে জামায়াতের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মো. মোবারক হোসাইন, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমীর এডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন ও সহকারী সেক্রেটারি মুহাম্মদ কামাল হোসেন এমপি এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম ও সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা, ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম, ইসলামী ছাত্রশিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ও ডাকসু এজিএস মহিউদ্দিন খানসহ ডাকসু নেতৃবৃন্দ, জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্র ও মহানগরীর বিপুল সংখ্যাক নেতা-কর্মী।

এ সময় মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আমরা গণভোটের রায় বাস্তবায়নে কোনরকম জনগণের রায়ের সাথে বিরুদ্ধাচরণে ছাড় দেব না। কোন হুমকি দিয়ে, টালবাহানা করে, গণ রায় বাস্তবায়নের এই সংগ্রামে পথ থেকে কোনরকম বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। যে জাতি, যে ছাত্রসমাজ রক্ত দিয়ে এই কঠিন ফ্যাসিবাদকে বিদায় দিতে পারে, সেই শক্তির সামনে, আপনাদের মতো নতুন ফ্যাসিবাদীদের পথে যারা যাত্রা শুরু করেছেন, তাদের কোন গুরুত্ব, কোন মূল্য, এই ছাত্রসমাজের কাছে হবে না।

তিনি আরো বলেন, বিএনপি, একাত্রিশ দফার প্রথম দফায় বলেছে, আমরা রাষ্ট্র ক্ষমতায় গেলে, সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন করব। এখন তারা, সংস্কার বোঝেন না, সংশোধনের নামে, রক্তাত্ত্ব জুলাই সনদকে এড়িয়ে, তাদের মন মতো করে জুলাই সনদের প্রতি অবিচার করার ষড়যন্ত্র তারা শুরু করেছেন।

ছাত্রশিবির সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, বিএনপি গণভোটের রায় পর্যন্ত মেনে নিচ্ছে না। জনগণের সাথে শেষ পর্যন্ত প্রতারণা করে সংসদে দাঁড়িয়ে আমরা তাদেরকে বলতে দেখছি, যে মূল চুক্তির কথা বলেছিলাম, এই হলো নির্বাচনের জন্য। যখন তারা ভোট দিয়েছিল, ভোটে তার পক্ষে ক্যাম্পেইন করেছিল, শুধুমাত্র এই কারণে যাতে সরকার ভোটের ব্যবস্থা করে। এই কথাটা সংসদে দাঁড়িয়ে যখন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা বলে, তখন স্পষ্টতভাবে আমাদের কাছে প্রতিভাত হয়, এর পূর্বে যারা জাতির সাথে মুনাফিকি করেছে, সেই একই আচরণ এখন তারা প্রদর্শন করতে যাচ্ছে। এই তরুণ প্রজন্ম বলে দিতে চায়, এই জাতির সামনে বারবার যারা প্রতারণা করেছে, এই দেশ থেকে তাদেরকে চিরতরে বিতারিত করা হয়েছে। ফাসিবাদ মুক্ত করা হয়েছে। এই জাতির ইতিহাস বহুত পুরাতন। এই জাতিকে যারা শাসন করতে চেয়েছে, তারাই এই পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। বাংলাদেশে আর যদি কোন কাঠামো গড়ে ওঠে, সেই কাঠামো আবার ভেঙে পড়বে ইনশাল্লাহ। আমরা জনগণের সাথে থেকে, জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য বদ্ধপরিকর। ইসলামী ছাত্রশিবির, তাই জনগণকে সাথে নিয়ে, ছাত্র সমাজকে সাথে নিয়ে, প্রতিটি গ্রামে, পাড়া-মহল্লায় এবং প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই জুলাইয়ের চেতনাকে জাগ্রত রাখার জন্য, তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে আমরা আন্দোলন করছি। গণহত্যার বিচারের দাবি আদায় করে আমরা ছাড়ব ইনশাল্লাহ।

এ সময় জামায়াত আমীর নেতৃবৃন্দকে সাথে নিয়ে ডাকসু নেতৃবৃন্দের সাথে মতবিনিময় করেন এবং ইনকিলাব মঞ্চের সাবেক আহ্বায়ক শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদীর কবর জিয়ারত করেন।